বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে জাফরান চাষ সম্ভব

নিজস্ব প্রতিবেদকনিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩:২০ অপরাহ্ণ, ২৫/০৮/২০২১

‘লাল সোনা’ নামে পরিচিত পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মসলা জাফরান শীতপ্রধান অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। তবে আলো-আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কক্ষে জাফরানের ফুল ফুটিয়ে সফলতা পেয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ফ ম জামাল উদ্দিন। ফুল থেকে সফলভাবে সংগ্রহ করেছেন লাল রঙের স্টিগমা (গর্ভমুণ্ড)। এটাই মূলত জাফরান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

জাফরান- যার ইংরেজি নাম স্যাফ্রন। বাংলায় কুমকুম নামেও পরিচিত। ক্রোকাস স্যাটিভা নামের একটি ফুলের গর্ভদণ্ড থেকে জাফরান উৎপাদন করা হয়। এক পাউন্ড বা ৪৫০ গ্রাম শুকনো জাফরানের জন্য ৫০ থেকে ৭৫ হাজার ফুলের দরকার হয়। অর্থাৎ এক কেজি জাফরান পেতে দরকার অন্তত দেড় লাখ ফুল। বিশ্বে জাফরানের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করে ইরান। ভারতের কাশ্মীর, স্পেন, ইতালি, পাকিস্তান ও তুরস্কও জাফরানের জোগান দিয়ে থাকে।

এই অধ্যাপকের ভাষ্য, উন্মুক্ত জায়গায় উপযুক্ত পরিবেশেও জাফরান চাষ বেশ ব্যয়বহুল। সে হিসেবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কক্ষে উৎপাদন খরচ আরেকটু বেশিই হওয়ার কথা। কিন্তু এই পদ্ধতিতে আবহাওয়াজনিত কারণে ফসল মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। আর বছরে একাধিক বার ফলন ওঠানো যাবে।

তাই এই গবেষক মনে করেন, এর সঙ্গে বিশ্বব্যাপী জাফরানের বিপুল চাহিদা ও দামের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সাপেক্ষে বাংলাদেশেই এর লাভজনক বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব। ডেইলি স্টার

বংশবিস্তারের জন্য এই কুমকুম মানুষের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। জাফরান চাষের প্রতিটি ধাপের সবকিছুই করতে হয় হাতে হাতে। তাই এর উৎপাদন খরচও বেশি। রোপিত করম বা বাল্ক্ব আকারে বড় ও পুষ্ট হলে প্রথম বছর একটি ও পরবর্তী বছরগুলোতে একেকটি গাছে সাত থেকে আটটি পর্যন্ত ফুল ধরে। বিশ্ববাজারে প্রতি গ্রাম জাফরানের দাম চার ডলারের মতো। সে হিসাবে প্রতি কেজি জাফরানের দাম প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা।

অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, শীতপ্রধান এলাকাগুলোতে যেভাবে উন্মুক্ত পরিসরে জাফরানের চাষ হয়, বাংলাদেশে সেভাবে জাফরান উৎপাদন করা সম্ভব নয়। কারণ এখানে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে মাটির নিচে করম (কন্দ) দ্রুত পচে যায়। আবার মাটির আর্দ্রতার কারণে গাছ তরতরিয়ে বাড়লেও ফুল আসে না। ইরান কিংবা কাশ্মীরে প্রতি হেক্টরে জাফরানের ফলন হয় দুই থেকে আড়াই কেজি। তবে মাত্র ১০০ বর্গফুট আয়তনের কোনো গ্রিনহাউস কিংবা নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার ঘরে বছরে সমপরিমাণ জাফরান উৎপাদন করা যাবে।

Nagad

উন্মুক্ত জায়গা এবং উপযুক্ত পরিবেশেও জাফরান চাষ বেশ ব্যয়বহুল। সে হিসাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কক্ষে উৎপাদন খরচ আরেকটু বেশিই হওয়ার কথা। কিন্তু এই পদ্ধতিতে আবহাওয়াজনিত কারণে ফসল মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তা ছাড়া বছরে একাধিকবার ফলন উঠানো সম্ভব।

এ সম্পর্কে অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, গত বছর জাপান থেকে জাফরানের পাঁচ শতাধিক করম নিয়ে এসে প্রথমে সেগুলো ফ্রিজে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রেখে রোপণের উপযোগী করা হয়। তারপর তা ঘরের মধ্যে পল্গাস্টিক ও টিনের তৈরি ট্রেতে রোপণ করা হয়। দেখা যায়, প্রায় সবগুলো গাছেই ফুল এসেছে। সাধারণত জাফরান চাষে বিস্তৃত জায়গার দরকার হয়। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেছে, অ্যারোপনিক্স পদ্ধতিতে (বাতাসের মাধ্যমে গাছের খাদ্য উপাদান সরবরাহ) একটা ছোট আকারের ঘরের মধ্যেই এক হেক্টর সমপরিমাণ জায়গায় জাফরান উৎপাদন করা সম্ভব। কারণ এ পদ্ধতিতে রোপণ করা গাছের ট্রেগুলো উলম্বভাবে সাজিয়ে রাখা হয়। ফলে জায়গা লাগে কম।

জাফরান চাষের সীমাবদ্ধতা

করম সংগ্রহ এবং ব্যয় নির্বাহ করাই জাফরান চাষের বড় সীমাবদ্ধতা। এ কথা জানানোর পাশাপাশি অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, কাশ্মীর বা ইরান থেকে করম বা বাল্ক্ব এনে জাফরান উৎপাদন করার সামর্থ্য আমাদের নেই। কারণ একটি করম বাইরে থেকে আনতে গড়ে প্রায় ৬০ টাকা খরচ পড়ে। সে হিসাবে দেড় লাখ করম সংগ্রহ করতে খরচ পড়বে প্রায় ৯০ লাখ টাকা। পাশাপাশি এসবের দেখভালের জন্য প্রয়োজন হবে জনবল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের দুটি যন্ত্র ও বাতি। খরচ কমিয়ে আনার জন্য একবার করম সংগ্রহ করে পরে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে অনেক চারা তৈরি ও পর্যায়ক্রমিক চাষের মাধ্যমে সারা বছর এর ফলন পাওয়া সম্ভব। যদিও উন্মুক্ত পরিসরে বছরে তা একবারই পাওয়া যায়। সরকার যদি করম বা বাল্ক্ব এনে দেওয়ার ব্যবস্থা করে তবে ঘরে ঘরে জাফরান চাষাবাদের ব্যবস্থা তৈরি করা যাবে।

এ সময় গবেষক অধ্যাপক ড. জামাল আরও বলেন, এর আগে গণমাধ্যমে দইগোটা নামের একটি গাছকে জাফরান হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিন-চার মিটার উঁচু এই গাছে গোলাপি রঙের এক ধরনের দানা হয়। এই দানা গুঁড়া করলে জাফরানের মতো রং হয়। এই দইগোটাকে এ দেশে জাফরান চাষ বলে প্রচার করা হয়েছে। এতে অনেকেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু এটি জাফরান নয়। জাফরান গাছ সাধারণত ১৮ ইঞ্চি লম্বা হয়।

ব্যবহার ও চাহিদা

জাফরান এতই ব্যয়বহুল যে সবার পক্ষে এটি ব্যবহার করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিন্তু অল্প জাফরান ব্যবহার করেও এ থেকে উপকারিতা পাওয়া যায়। সে দিক থেকে এটি অনেকটাই সাশ্রয়ী।

জাফরান আমাদের দেশে রান্না, মূলত জর্দা নামের মিষ্টান্ন ও পায়েস তৈরিতে, বিরিয়ানির সুন্দর রং করতে ব্যবহৃত হয়। দামি প্রসাধন সামগ্রী হিসেবেও জাফরান ব্যবহার্য। প্রাচীনকালে জাফরান গায়ে মাখা হতো শরীরের সৌষ্ঠব বাড়ানোর জন্য। ত্বক এর গুণে লাবণ্যময় হয়ে ওঠে। এতে আছে অ্যান্টিমুটাজেনিক এবং অ্যান্টিটেসিভ এজেন্ট যা টক্সিকেশন সরিয়ে স্কিনের স্পর্শকাতরতা দূর করে। এ ছাড়া এর অ্যান্টিসোলার এজেন্ট রোদে পোড়া কালচে দাগ দূর করে সানবার্ন থেকে রক্ষা করে। ত্বকে খুব ভালো ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে এই জাফরান। এতে আছে ম্যাঙ্গানিজ, অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি এবং অ্যান্টি ফাঙ্গাল এজেন্ট- যা ব্লাড সুগার নিরাময় করে শরীরের প্রয়োজনীয় হরমোন বিকাশ করে। আছে ভিটামিন সি- যা মুখাবয়ব এবং শরীরকে ইনফেকশন বা সংক্রমণ হওয়া থেকে রক্ষা করে। চিকিৎসাক্ষেত্রে রয়েছে এর বহুবিধ ব্যবহার। এ ছাড়া জাফরান থেকে প্রস্তুত করা হয় জাফরান কালি- যার রয়েছে বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য। সূত্র; সমকাল

 

 

সারাদিন/২৫আগস্ট/এএইচ