খুলনায় সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় বুক ভাসালেন সন্তান হারা ধর্ষিতার মা

খুলনা প্রতিনিধি:খুলনা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: ৩:৩২ অপরাহ্ণ, ১৩/০৪/২০২১

খুলনার কথিত সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ানের বিরুদ্ধে বেশ কিছুদিন ধরে কানাঘুষা চলছে মিডিয়াপাড়ায়। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ শারীরিক নির্যাতন ও অর্থ আত্মসাতের কিছু ভিডিও-চিত্র দৃশ্যমান হয় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল” আর টিভি” তে। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে তার কৃতকর্মের কিছু বাস্তব চেহারা।

জানা যায়, সোহাগ দেওয়ানের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, অর্থ আত্মসাৎ সহ আনিত বিভিন্ন অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার জন্য শাক দিয়ে মাছ ঢাকার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন সোহাগ দেওয়ান। ভুক্তভোগী ফরিদা ইয়াসমিন মনির দেওয়া তথ্যমতে, প্রশাসনের ভীতি প্রদর্শন করে দলবলসহ ধর্ষণের ভিডিওগুলো ভাইরাল করার হুমকিসহ সোহাগ দেওয়ানের সকল অনৈতিক কার্যকলাপ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরই এগুলো ধামাচাপা দেওয়ার জন্য একের পর এক মিথ্যা অপপ্রচার ছড়াচ্ছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

এই মিথ্যা অপপ্রচারের প্রতিবাদে সোমবার (১২ই এপ্রিল) খুলনা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করেন কথিত পুলিশ ও র‌্যাবের সোর্স সোহাগ দেওয়ানের নিকট নির্যাতনের স্বীকার ফরিদা ইয়াসমিন মনি। তিনি জানান সোহাগ দেওয়ানের সাথে তার পরিচয় হয় ২০১৭ সালে। সে সময় তার তার ছেলে মোসুম হাসান নীল হারিয়ে গেলে খুলনা প্রেসক্লাবে এসে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনের লিখিত কপিতে নাম ও মোবাইল নম্বর নিয়ে ফোনালাপ শুরু করেন সোহাগ দেওয়ান।এ কপর্যায়ে নিজেকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সাংবাদিক এবং র‌্যাব ও পুলিশ বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিয়ে হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। কিছুদিন পর ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশ্বাস দিয়ে খুলনার বসুপাড়ায় খালাতো বোন পরিচয়ে একটি বাসা ভাড়া নেন ও নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করেন, যেটি বাড়ির মালিক অবগত।

সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ্য, ঢাকায় অবস্থানকালে মনি’র নিকট থেকে সন্তান উদ্ধারের কথা বলে স্ট্যাম্পের চুক্তি অনুযায়ী ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা নেয় সোহাগ দেওয়ান। কিছুদিন পরেই “ছেলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে”, এরূপ একটি সংবাদ দিয়ে ভারতে যাওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। ছেলেকে পাওয়ার আশায় মরিয়া হয়ে ভারতে যেতে দ্বিধা বোধ করেন নি ভুক্তভোগী নারী মনি ।

মনি’র তথ্যমতে, ছেলের সন্ধানে ভারতে গিয়ে সোহাগ দেওয়ান বন্ধু বান্ধবীদের নিয়ে ভিন্ন কামরায় ফুর্তিতে মেতে থাকতেন সর্বদা। ছেলের প্রসঙ্গে কথা বললে, বিভিন্ন আশানুরূপ কথা বলে সোহাগ বলেন আরও একবার ভারত আসতে হবে, এবার পাওয়া যাই নাই। একথায় ভুক্তভোগী মনি বুজতে সক্ষম হন সোহাগ প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন এবং তখনই একা বাংলাদেশে ফেরত আসেন ও উকিল নোটিশের মাধ্যমে চুক্তির টাকা ফেরত চান। পরে খুলনা থানায় একটি জিডি করলে, জিডি তোলার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন সোহাগ দেওয়ান এবং কিছু টাকা দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন তিনি। জিডি তোলার প্রসঙ্গে খুলনা থানার তদন্ত কর্মকর্তা অনুরোধ করলে জিডিটি উত্তোলন করে নেন মনি।

পরবর্তীতে টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্দেশ্যে সোহাগ দেওয়ান তার নিজস্ব বাসায় নিয়ে যান । সে সময় সোহাগ দেওয়ানের সহযোগী এডভোকেট মেহেদী পূর্বেই উপস্থিত ছিলেন । বাসায় তার স্ত্রীর অনুপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ভুক্তভোগী মনিকে শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করেন। একপর্যায়ে মনি চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করেন এবং শরীরের সকল শক্তি হারিয়ে যায়। এর পরে শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। বেশ কিছুক্ষণ অচেতন অবস্থায় থাকার পর সোহাগ ও মেহেদী শরীরে পানি ঢেলে দেওয়ায় জ্ঞান ফিরে পায় এবং উপলব্ধি করতে পারেন তার শরীরে কোন কাপড় নেই। তখন তিনি বুঝতে সক্ষম হন যে ধর্ষণের স্বীকার হয়েছেন।

Nagad

তিনি আরও জানান, কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর, সোহাগ দেওয়ান ও মেহেদী হাসান বলেন, ” টাকা দিতে পারব না, যা পারিস তাই কর। এই দেখ তোর খোলামেলা ভিডিও, ধর্ষণের সব ভিডিও রেকর্ড করেছি। সকল ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল করব। টাকা চাইলে তোর জীবন শেষ করে ফেলব, এখন থেকে যা বলব তাই করবি । পুলিশ প্রশাসন সব আমার হাতের মুঠোয়, তোকে গাজা দিয়ে ধরিয়ে দিব।

মনি জানান, “অচেতন অবস্থায় শারীরিক নির্যাতনের কারণে শরীরে কম্পন হতে থাকে। এমতাবস্থায় আমি সোনাডাঙা থানায় যাই এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে না পেয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি। তারা বিভিন্ন হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনের এক পর্যায়ে আত্মসম্মানের কথা চিন্তা করে আমি তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করি। পরবর্তীতে মামলা না করেই আমি সোনাডাঙ্গা থানা ত্যাগ করি। একদিকে ছেলে হারানোর চাপা কষ্ট অন্যদিকে টাকা আত্মসাৎ, তার পরে আবার নিজের সর্বশরীর বিলীন হয়ে যাওয়া ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসি।

জানা যায়, এত কিছুর পরেও স্বাদ না মেটা ক্ষমতার মগডালে বসবাসকারী কথিত সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ান ও এডভোকেট মেহেদী হাসান ক্ষান্ত হননি । এরপর প্রায়ই ভুক্তভোগী মনিকে ভিডিও ফাঁসের ভয় দেখিয়ে ঢাকায় গিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করেন সোহাগ ও তার সহযোগী মেহেদী হাসান। বারংবার একই ভয় দেখিয়ে মারপিট ও বেধে ধর্ষণ সহ সকল প্রকার হিনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় তারা।

দীর্ঘদিন এই কষ্ট সহ্য না করতে পেরে একপর্যায়ে মুগদা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ সংশোধনী ২০০৩ এর ৯(৩)/১০/৩০ একাধিক ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানি ও সহায়তা করার অপরাধে একটি মামলা দায়ের করি, যার নং – জি আর ৪১/১৫৭.উল্লেখ্য, জানা যায় মামলা টি করবার পরে আরও বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে, বিশেষ ক্ষমতাবল দেখানো সোহাগ দেওয়ান। প্রশাসনের আস্থা অর্জনকারী সোহাগ দেওয়ান প্রশাসনেরই নাম ভাঙ্গিয়ে এখনো নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছেন ভুক্তভোগী মনিকে।

মনি অভিযোগ করেন, তার এসকল কর্মকাণ্ড ঢাকার জন্য বিভিন্ন অপপ্রচার করছেন তিনি। সোহাগ দেওয়ান বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টালে মনি ও তার ভাই নবাব খানের বিরুদ্ধে মাদক ও ইন্ডিয়ান ঔষধ বিক্রির বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে জানান ভুক্তভোগীর ভাই নবাব খান। তিনি আরও জানান, ফেসবুক মেসেঞ্জারে সোহাগ দেওয়ান এসব মামলা উঠিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেন। তাতেই তার মঙ্গল হবে বলে মনে করছেন সোহাগ দেওয়ান।

এমতাবস্থায় নির্যাতিতা নারী হয়ে প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙ্গানো কথিত সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ানের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের দাবি জানান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট ।

সারাদিন/১৩এপ্রিল