‘রাজউক ছাড়পত্র-নকশা অনুমোদনে দালালের মাধ্যমে চুক্তি করে’

নিজস্ব প্রতিবেদকনিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৬:২১ অপরাহ্ণ, ২৯/০১/২০২০

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে বলছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক) অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছাড়পত্র-নকশা অনুমোদনে দালালের মাধ্যমে চুক্তি করে থাকে। রাজউকের কর্মকর্তা, দালাল ও সেবাগ্রহীতার মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আঁতাতের মাধ্যমে চুক্তি করে সুনির্দিষ্ট হারে নিয়ম বহির্ভূত অর্থ নেয়া হয়।

বুধবার (২৯ জানুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে মাইডাস সেন্টারে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। এছাড়া সেবাগ্রহীতা ইমারত নকশা অনুমোদনে নির্ধারিত ফি-এর অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হন বলে জানান তারা।

গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন টিআইবির ডেপুটি ম্যানেজার (গবেষণা ও পলিসি) ফাতেমা আফরোজ এবং প্রোগ্রাম ম্যানেজার (গবেষণা ও পলিসি) ফারহানা রহমান। এসময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, টিআইবির নির্বাহী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি পরিচালক মোহম্মাদ রফিকুল হাসান প্রমুখ।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজউকে ছাড়পত্র অনুমোদনে ঘুষের পরিমাণের নির্ধারকগুলো হচ্ছে রাস্তার প্রস্থ, জমির পরিমাণ, জমির ব্যবহার, জমির অবস্থান বা এলাকা, সেবাগ্রহীতার ধরন। এছাড়া সেবাগ্রহীতা অনেক সময় বহিরাগত দালালদের মাধ্যেমে হয়রানি ও অর্থ আত্মসাতের শিকার হয়ে থাকেন। আবার জরিপের সময়ও চুক্তিভিত্তিক নিয়ম বহির্ভূত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাস্তা প্রশস্ত দেখানোর জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেয়া হয়। ছাড়পত্র অনুমোদনে ব্যক্তি পর্যায়ে ১৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার পর্যন্ত এবং রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে এক লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।

এতে আরও উল্লেখ করা হয়, নাগরিক সনদ ও বিধিমালায় ছাড়পত্র অনুমোদনের নির্ধারিত সময় যথাক্রমে ১৫ দিন ও ৩০ দিন উল্লেখ থাকলেও সে সময়ে অনুমোদন না পাওয়ার অভিযোগ আছে। কিন্তু জনবল ঘাটতি থাকায় এবং ভূমি সংক্রান্ত কাগজপত্র পরীক্ষা করতে অনেক সময় লাগে বলে তারা নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে অনুমোদন দিয়ে থাকে।

প্রতিবেদনে জানান, এছাড়া অনেক সময় জমির মালিক জরিপের সময় উপস্থিত থাকেন না বলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ছাড়পত্র প্রদানে দেরি হয় বলে রাজউক কর্মকর্তাদের অভিমত। ছাড়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে সাধারণত এক মাস থেকে দুই মাস পর্যন্ত সময় লাগে। নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ না দিলে এ সময় আরও দীর্ঘায়িত হয়।

সেবাগ্রহীতারা ইমারতের নকশা অনুমোদন পেতে নির্ধারিত ফি-এর অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হন। সাধারণত রাজউক কর্মকর্তা, দালাল ও সেবাগ্রহীতার মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আঁতাতের মাধ্যমে চুক্তি করে সুনির্দিষ্ট হারে নিয়মবহির্ভূত অর্থ নেয়া হয়। দালালরা রাজউকের কর্মচারী বা বহিরাগত হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে রাজউক কর্মকর্তা সরাসরি সেবাগ্রহীতার সাথে চুক্তি করে। চুক্তির অর্থের পরিমাণ বিভিন্ন নির্ধারকের ওপর নির্ভর করে।

নকশা অনুমোদনে ঘুষের পরিমাণের নির্ধারকসমূহ হচ্ছে জমির পরিমাণ, জমির অবস্থান বা এলাকা, জমির ব্যবহার, মালিকানার সংখ্যা, দালালের ধরন/পর্যায়, উচ্চতার সীমা লঙ্ঘন, তলার সংখ্যা এবং জমির নথিতে ক্রটি। ব্যক্তি পর্যায়ে ১০তলা পর্যন্ত ইমারতের নকশা অনুমোদনে ফি-এর অতিরিক্ত ৫০ হাজার থেকে চার লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার পর্যায়ে দুই লাখ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।

আবার ১০ তলার বেশি ইমারতের নকশা অনুমোদনে রিয়েল এস্টেট ডেভলপার পর্যায়ে ফি-এর অতিরিক্ত ১৫ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। বৃহদায়তন বা বিশেষ প্রকল্পের ক্ষেত্রে রিয়েল এস্টেট ডেভলপার পর্যায়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পরিমাণ ১৫ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত।

বক্তব্য রাখছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। ছবি: টিআইবি

 

ত্রবিশেষে দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে এমন অভিযোগেও রয়েছে। তবে অর্থের পরিমাণ বেশি হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও কাজ সম্পন্ন হয়। রাজউকের কর্মকর্তাদের পরিচিত স্থপতি বা নির্ধারিত ফার্মের (যাদের সাথে যোগসাজশ আছে) মাধ্যমে নকশার কাজ করলে কম সময়ে নকশা অনুমোদন হয়। অন্যথায় দেরিতে নকশা অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে বহিরাগত দালাল সেবাগ্রহীতাকে বারবার ঘুরিয়ে হয়রানি করে। তারা অর্থ আত্মসাৎ করে পালিয়ে যায় বা সেবাগ্রহীতার সাথে যোগা বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তখন সেবাগ্রহীতাকে আবার নতুন করে অন্য কোনো দালালের সাথে চুক্তি করতে হয়। এ ছাড়া প্রকৌশলী বা স্থপতির স্বাক্ষর নকল করে নকশা অনুমোদন করারও অভিযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন স্থপতি জানতে পারেন তার স্বাক্ষর নকল করে নকশা অনুমোদন করা হয়েছে। তখন তিনি আবেদন করেন এবং ব্যবস্থা নিতে বলেন। কিন্তু অভিযােগের পাঁচ বছর পরেও দোষী ব্যক্তির কোনো শাস্তি হয়নি।

ভবন নির্মাণের আগে, নিমণের সময় এবং পরে পরিদর্শন করার নিয়ম। ইমারত বিধিমালা, ২০০৮ অনুসারে অনুমাদিত নকশা কতদূর অনুসরণ করা হচ্ছে তা দেখার জন্য রাজউকের নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করার কথা। কিন্তু তার পরিবর্তে নির্মাণের সময় এবং পরে চুক্তিভিত্তিক নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ আদায় করা হয়। সাধারণত এ পরিমাণ পাঁচ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। আবার বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্র অতিরিক্ত হলে পরিদর্শক বারবার পরিদর্শন করেন এবং এ ক্ষেত্রে ঘুষের পরিমাণও বেড়ে যায়।

প্রকল্প পরিকল্পনার শুরুতে ক্ষত্রিস্তদের তথ্য ভাণ্ডার প্রস্তুত না করায় জমি অধিগ্রহণের আগে সরকারি কর্মকর্তা, তাদের আত্মীয়-স্বজন এবং প্রকল্প এলাকার পাশে বসবাসকারী ব্যবসায়ীরা অধিগ্রহণে কম মূল্য পাবেন এমন গুজব তৈরি করে স্থানীয়দের জমি ক্রয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক হিসেবে তালিকাভুক্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর আওতায় নকশা অনুমোদন ও বাস্তবায়নে নিয়ম লঙ্ঘনের শাস্তি বৃদ্ধি করতে হবে এবং ইমারত ব্যবহারের আগে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট না নেয়ার ক্ষেত্রে জরিমানা ধার্য করতে হবে।

নকশা পরিকল্পনা অনুমোদনে অগ্নি নিরাপত্তা নকশা এবং কাঠামােগত নকশা জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। বহুতল ভবনের সংজ্ঞায়নে অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইনের সাথে সংগতিপূর্ণ করে ছয় তলার উর্ধ্বে নির্মিত ইমারতকে বহুতল ভবন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা, ২০০৪ এর আওতায় প্লট বিতরণের কত সময়ের মধ্যে ইমারত নির্মাণের কাজ শুরু করতে হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে ইত্যাদি।

সারাদিন/২৯জানুয়ারি/টিআর