বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন বণ্টনের ব্যাপারে ইউজিসির খবরদারি

নিজস্ব প্রতিবেদকনিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:৪৪ অপরাহ্ণ, ২৪/১১/২০১৯

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে আসন সংখ্যা নির্ধারণ করার পুরো খবরদারি করবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সম্প্রতি এবিষয়টি নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেওয়া ইউজিসির নোটিশে এতথ্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই নির্দেশকে অযৌক্তিক বলে অভিযোগ করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষাদানের সক্ষমতা একই রকম নয়। ফলে এ ধরনের নির্দেশের কারণে শিক্ষার্থীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আর এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কমলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা না করার প্রবণতা বাড়বে। এছাড়াও অনেকে দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে লেখাপড়া করার প্রবণতাও বাড়বে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জাতীয় অধ্যাপক বলেন, পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সব যোগ্যতা থাকার পরও কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে না শিক্ষার্থীরা। অন্য দেশে তো এরকম নিয়ম নেই। সব দেশেই শিক্ষার একটা মান রয়েছে। আর বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় তো খারাপ নয়। তারা যেমন শিক্ষা দেয় তা অনেক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও দেয় না। আর এই সীমিত আসনের অজুহাতে ছাত্র-ছাত্রীরা কোথাও পড়বে না। আর ভর্তিরও সুযোগ পাবেন না।

এসব অভিযোগের জবাবে ইউজিসি কর্তৃপক্ষ বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীর পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

এর আগে, গত বুধবার শিক্ষার্থী ভর্তির আসন সংখ্যা নির্ধারণ করে একটি আদেশ জারি করে ইউজিসি। প্রতিষ্ঠানটির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক ড. মো. ফখরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়, যেসব প্রোগ্রাম বা কোর্স অনুমোদনের সময় আসন সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে প্রতি সেমিস্টারে ল্যাব সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রাম বা কোর্সে সর্বোচ্চ ৫০ জন এবং অন্যান্য প্রোগ্রাম বা কোর্সের জন্য প্রতি সেমিস্টারে সর্বোচ্চ ৬০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে। কমিশনের অনুমোদন ছাড়া আসন সংখ্যা কোনোভাবেই বাড়ানো যাবে না বলেও ওই নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ডিন বলেন, ২০১৯ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৯ জন। এখন ইউজিসির নির্দেশ মানতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আসন যেমন ভয়াবহ আকারে কমবে, একইসঙ্গে শিক্ষকদেরও চাকরিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে। এতে ক্ষতি হবে সরকারের ও দেশের জনগণের। এতে অনেক শিক্ষার্থীই অর্ধ শিক্ষিত বা এইচএসসি পাশই থাকবে। তারা আর উপরে যেতে পারবে না।

এই প্রসঙ্গে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ইউসুফ মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ‘ভুলে গেলে চলবে না, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যদি কেউ মনে করেন, এ ধরনের আইন করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আটকানো যাবে, তাহলে বলবো, আপনারা আসলে দেশকে আটকাচ্ছেন।’

অধ্যাপক ইউসুফ মাহবুবুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সিটপ্রতি ৬৫ জন শিক্ষার্থী লড়াই করেন। যাদের মধ্যে একজন মেধা তালিকায় টিকে যান। বাকি ৬৪ জন ভর্তিবঞ্চিত হন। এ কারণে লক্ষাধিক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নেওয়ার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এখন যদি সুযোগ থাকার পরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে না পারে, তাহলে সেটি কি যৌক্তিক হবে?’

ইউজিসির নির্দেশনাকে অযৌক্তিক বলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য বলেন, ‘নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটি প্রোগ্রামে ৪০০ শিক্ষার্থী পর্যন্ত ভর্তি নেয়। এখন সেই জায়গায় ৬০ জনে নামিয়ে আনলে বাকি ৩৪০ জন শিক্ষার্থী কোথায় যাবেন? ইউজিসি কি নির্দেশনা জারির সময় সেই বিষয়টি একবারও ভেবে দেখেছে?’

তিনি আরো বলেন, সব দেশই শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক কিছু করেন। কিন্তু এই স্বিদ্ধান্তের কারণে অনেক শিক্ষার্থীই লেখাপড়া করবেন না বলে ভাবছেন কি? আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় অধিকাংশ শিক্ষকই পাবলিকের। তারা তো শিক্ষার্থীদের তাদের সবচেয়ে ভালোটাই দেয়। তবে এতো কম হলে তো সব দিক থেকেই সমস্যা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবীর হোসেন বলেন, ‘শিক্ষার্থী সংখ্যা কেমন হবে, সেটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই প্রশ্ন উঠছে। আসন কমিয়ে শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করলে সেটি কারও জন্যই ভালো হবে না।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমিতি আছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আছে। এসব বিষয়ে তাদের সঙ্গে ইউজিসির আলোচনা করে নেওয়া উচিত ছিল।’

রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘পাত্রের ক্রাইসিসের কারণে ছোট পাত্রে যে পরিমাণ ধরে, বড় পাত্রেও সেই পরিমাণ রাখতে হবে, এটি কোনও নিয়ম হতে পারে না। বৈজ্ঞানিক মত হলো, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কত শিক্ষার্থী নেওয়া যাবে, এটি নির্ধারণ করতে চাইলে কোন বিভাগে কতজন শিক্ষক, কীভাবে তাদের শিক্ষার্থীদের মানসম্মত লেখাপড়ার সুযোগ করে দেবেন, এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জানাবে। এর বাইরে গিয়ে ইউজিসির নতুন নির্দেশনা মানতে বাধ্য করলে আসন কমে যাবে। তাতে, সুযোগ থাকার পরও কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাদান থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের এসব মন্তব্য-বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীর পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। আমরা নিজস্ব প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতা, শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করে শিক্ষার্থী সংখ্যা নির্ধারণ করে দেই।

তবে এই আসন সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় কিনা, এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে সংখ্যা নির্ধারণ করে দেই। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় যদি তাদের সক্ষমতা দেখাতে পারে, তাহলে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ আছে। সেটি কোনও সমস্যা নয়।

এপ্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষাবিদ বলেন, ইউজিসি তো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো দূর্নীতিই ধরতে পারে না। এছাড়া তার কোনো নিয়ম নীতি পালন করে না সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থী কত জন নেওয়া হবে তাও ইউজিসির নিয়ম মতো পালন করে না। আসলে দূর্বলদের ওপরে এভাবে নির্যাতন মোটেও দেশের জন্য ভালো হবে না। তাই বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরে এমন খবরদারি কেউ মানতে পারে না। তাই ইউজিসিকে এই বিষয়ে আবারো ভাবার জন্য অনুরোধ করছি।