শীতে অসুখ বেড়েছে

তানভীর রায়হানতানভীর রায়হান
প্রকাশিত: ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ, ২৬/১২/২০১৯

শীতকালের শুরুতেই হিমেল হাওয়ায় কাঁপছে সারাদেশ। তবে কোথাও কোথাও ঝিরঝির বৃষ্টির পর রোববার (২২ ডিসেম্বর) মৌসুমের দ্বিতীয় শৈত্যপ্রবাহ শুরুর আভাস দিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। কিন্তু শৈত্যপ্রবাহ নামল বৃষ্টির আগেই। আর গত কয়েকদিন পরে রাজধানীতে বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) সকাল নয়টা থেকে সূর্য প্রখরতা লক্ষ্য করা গেছে।

বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। দেশের উত্তরের এ জেলায় তাপমাত্রার পারদ নেমে আসে ৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের পাশাপাশি টাঙ্গাইল ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় বয়ে যাচ্ছে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ।

শীতে সক্রিয় রয়েছে রোটা ভাইরাস। এ কারণে ডায়রিয়া আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। এক-দুই মাস বয়সি থেকে শুরু করে ৫ বছর বয়সি শিশুরা রয়েছে ঝুঁকিতে। ডায়েরিয়া ও শ্বাসতন্ত্রজনিত নানা রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন অভিভাবকরা।

এ ছাড়া চর্মরোগ, চোখের প্রদাহ, আমাশয়, জন্ডিসসহ আরও কিছু রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। ঢাকার পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা আর শীতের প্রকোপ বেশি থাকা উত্তরের জনপদেই আক্রান্তের হার বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, ৫৪ দিনে সারা দেশে শীতজনিত বিভিন্ন রোগে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫৭ জন আক্রান্ত হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে ঠান্ডাজনিত অসুখের কারণে ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সেন্টারের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার জানান, রাজধানী সহ সারা দেশেই শীতজনিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি নিয়ে সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছে রোগীরা। তবে রোগাক্রান্তদের মধ্যে শিশু-বৃদ্ধই বেশি। বিশেষ করে এই সময়ে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

সরকারি হিসাবে গত ১ নভেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৪ দিনে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় সারা দেশে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪২ হাজার ৬১২ জন। ডায়েরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১ লাখ ৬ হাজার ৮১৬ জন। অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ১৭৪ জন। আর গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে এআরইউতে ৯২৯ জন ও ডায়েরিয়ায় ১ হাজার ৯৫৮ জনসহ মোট ২ হাজার ৮৮৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

শিশুদের জন্য বড়দেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে চিকিৎসকরা বলেন, বাড়িতে কারো ঠান্ডা লাগলে তারা শিশুদের সামনে হাঁচি বা কাশি দেন। একজন বড় মানুষের হাঁচিতে লাখ লাখ জীবাণু থাকে। যা বাচ্চাদের শ্বাসের মাধ্যমে ঢুকে তাদেরও আক্রান্ত করে ফেলে। এ বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া বাইরের খাবার এসময় একদমই খাওয়া উচিত নয়। যেমন চটপটি, ফুচকা, বাইরের পানি, চা এগুলোতে এই সময় প্রচুর পরিমাণে জীবাণু থাকে যা শীতের সময় মাথাচাড়া দিয়ে উঠে।

বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু বহির্বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠান্ডাজনিত রোগে ভোগা শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা হাসপাতালে এসেছেন। তাদের মধ্যে শূন্য থেকে ৮ বছর বয়সি শিশুর সংখ্যাই বেশি। অধিকাংশেরই শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন ধরনের অসুখে ভুগছে।

ঢামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক রাজেশ মজুমদার বলছিলেন, আগে গড়ে দৈনিক ৩৫০ থেকে ৪০০ রোগী আসত। এখন তা কমে ২৫০ থেকে ২৭৫ জন হয়েছে। তবে হাসপাতালে আগের তুলনায় রোগীর সংখ্যা কম হলেও এআরআই ও কোল্ড ডায়রিয়া আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা নিয়ে আসছে।

এদিকে ঢাকার বাইরে উত্তরের শীতপ্রবণ বিভিন্ন জেলায় ঠান্ডাজনিত রোগাক্রান্ত বেশি বলে জানা গেছে। প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগ-বালাই বেড়ে যাওয়ায় এসব জেলার হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ভিড় বেড়েছে। হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।

আর কুড়িগ্রামে শীতের প্রকপে হাসপাতালে ডায়েরিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগী ভর্তি বেড়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শীতার্তদের কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে।
পঞ্জিকার হিসেবে শীত ঋতুর শুরু হয়েছে মাত্র দশ দিন হলো। তবে প্রকৃতিতে এবারের শীতের চিত্র ভিন্ন। কারণ শুরু থেকেই হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় কার্যত গোটা দেশই বিপর্যস্ত। তার ওপর টানা পাঁচ দিন বয়ে যাওয়া মওসুমের প্রথম শৈত্যপ্রবাহ শীতের মাত্রা বাড়িয়েছে আরও। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ঠান্ডাজনিত অসুখ-বিসুখও। বিশেষ করে শিশু আর বয়োবৃদ্ধদের ভুগতে হচ্ছে বেশি। এজন্য শীতের দিনগুলোতে বিশেষ সতর্কতার পরামর্শ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের।

আবহাওয়া অধিদপ্তর তথ্যমতে, বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর সারাদেশের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৬ দশমিক ২। এদিকে বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) থেকে দু-এক দিনের বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে আবহাওয়া অফিস। মাঝপৌষের বৃষ্টিতে শীতের মাত্রা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, উপ-মহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থান করছে। এছাড়া মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে।

এ অবস্থায় ফরিদপুর, মাদারীপুর, কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলসহ খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু-এক জায়গায় হালকা বা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র আকাশ আংশিক মেঘলাসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। একই সঙ্গে বৃষ্টির প্রভাবে সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস পেতে পারে।

বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) ঢাকায় সূর্যোদয় হয়েছে ভোর ৬টা ৩৯ মিনিটে আর সূর্যাস্ত হবে সন্ধ্যা ৫টা ১৯ মিনিটে।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার (২৪ ডিসেম্বর) পঞ্চগড়ের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) তা নেমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সামনে তাপমাত্রা আরো কমে আসতে পারে।

দিনাজপুরে গত ছয় দিন ধরে মৃদু শৈত্যপ্রবাহের পর গতকাল বুধবার থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। গতকাল দিনাজপুরে তাপমাত্রা ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।

সারাদিন/২৬ডিসেম্বর/টিআর