তৃণমূল থেকে বেড়ে উঠা শানিত নেতৃত্বের নাম ‘বিপ্লব বড়ুয়া’

বিশেষ প্রতিবেদকবিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১:০৬ পূর্বাহ্ণ, ২৫/১২/২০১৯

তৃণমূল থেকে বেড়ে উঠা শানিত নেতৃত্বের নাম ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। যিনি আওয়ামী লীগের নতুন কমিটির দপ্তরের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পেয়েছেন। তাকে চলতি বছরের মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেমন ছিলো তাঁর উঠে আসার গল্প

সারাদিনের পাঠকদের জন্য তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের কিছু অংশ জানাবার চেষ্টা করব। তাঁর কথা বলেছেন সারাদিন ডট নিউজের সিনিয়র রিপোর্টার।

সেই ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতি করায় তৎকালীন বিএনপি সরকারের নির্যাতনে শিকার হয়েছিলেন বিপ্লব বড়ুয়া। দলের জন্য ত্যাগ ও সততার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। তাকে ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য মনোনীত হন। এরপরে তাকে উপ-দফতর সম্পাদক করা হয়। এখন তাকে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক করা হয়।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর লন্ডন প্রবাসী বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বিধানের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে দলের দুঃসময়ের ভূমিকা রাখেন বিপ্লব বড়ুয়া।

জানা যায়, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রসারিত করার লক্ষ্যে নিরন্তন শ্রমিক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন বীর চট্টলার সন্তান বিপ্লব বড়ুয়া। তারুণ্য-দীপ্ত এই মেধাবী নেতৃত্বকে সম্মানও জানিয়েছে দল। নির্ভরতার প্রতীক রূপে নির্মোহ পরিচ্ছন্ন এই রাজনীতিককে দলের বিভিন্ন পদে আসীন করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা।

বিশ্লেষকরা বলেন, আগামীর রাজনীতি হবে সম্পূর্ণ মেধা ও জ্ঞান-নির্ভর। আর এই ময়দানে ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া সত্যিকারের এক বিপ্লবী সৈনিক। দলের জন্য ত্যাগ ও সততার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। এর আগে ১৯৯৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের অবৈতনিক গাইড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারও আগে সাংবাদিকতা করার সময় চিটাগাং জার্নালিস্ট ফোরাম- সিজেএফডি’র নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের তরুণ এই সদস্য ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লোহাগড়ার বড়হাতিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি সাতকানিয়া আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সুনীল কান্তি বড়ুয়ার ছেলে।

বিপ্লব শিক্ষা জীবনে সক্রিয় ছিলেন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। সাতকানিয়া সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাতকানিয়া থানা ছাত্রলীগের এড-হক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রলীগ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন।

যুক্তরাজ্যের উল্ভারহ্যাম্পটন ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরে যুক্তরাজ্যের সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে বার ভোকেশনাল কোর্স (পিজিডিএল), যুক্তরাজ্যের কল টু দ্য বার ‘দ্য অনারেবল সোসাইটি অব গ্রেস ইন’অর্জন করেন। ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া স্বাধীন বাংলাদেশে বাঙালি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বপ্রথম এবং একমাত্র ব্রিটিশ কোয়ালিফাইড ব্যারিস্টার।

হামলা নির্যাতন:

১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগের ত্যাগী নেতা বিপ্লব বড়ুয়া। ১৯৮৮ সালের ১২ এপ্রিল সাতকানিয়ায় জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। এরপর ১৯৯৪ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত অবস্থায় পুলিশের হামলায় আহত হন।

১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমীতে অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তৎকালীন অবৈধ প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আগমন প্রতিহত করতে গিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। ২০০২ সালে ছাত্রলীগ করার অভিযোগে খালেদা জিয়ার জোট সরকার বাংলাদেশ টেলিভিশনের বার্তা বিভাগের প্রযোজক পদ থেকে বে-আইনীভাবে চাকরীচ্যুত করে বিপ্লব বড়ুয়াকে।

ভয়াবহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর লন্ডন প্রবাসী বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বিধানের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে দলের দুঃসময়ের ভূমিকা রাখেন বিপ্লব বড়ুয়া।

১/১১ সরকারের সময়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০০৭ সালের পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে ব্রিটিশ সরকার ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন লাভের জন্যে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন তিনি। বিশেষ করে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের কাছে ই-পিটিশন প্রদানে অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় মিডিয়া সেন্টারে সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ সফরকারী বিদেশী সাংবাদিকদের যোগাযোগ ও সহযোগিতা প্রদান করেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে তার কাজ অসীম। তিনি চীনের সাথে দল ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে প্রশংসিত হন। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে দেশটি সফর করেন। পরের বছর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অনূর্ধ্ব ৪০ নেতাদের নিয়ে প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে চীন সফর করেন তিনি। এরপর ২০১৫ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সাথে চীন সফরে যান। ২০১৬ সালের জুন মাসে সিআরআই’র প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবেও চীন সফর করেন। ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে ১৪ দলের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে চীন সফর করেন বিপ্লব বড়ুয়া।

২০১৫ সালে আওয়ামী লীগের আমন্ত্রণে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দের সফরকালে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের সাথে চমৎকার সম্পর্ক গড়ে তোলেন এ নেতা।

আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইন্সটিটিউট (আইআরআই) এবং ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) এর সাথে বিভিন্ন কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সদ্য ঘোষিত দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়া বিপ্লব বড়ুয়া।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ভূমিকা:

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুর হলে সারাদেশে জামায়াত-বিএনপি’র হামলা যে সাম্প্রদায়িক তা বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের দূতাবাসে উপস্থাপন এবং এই নিয়ে জেনেভায় জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলসহ ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা এবং তাইওয়ানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ করে প্রশংসা পান এ মেধাবী তরুণ নেতা।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রতিতেও তার ব্যাপক কর্মকাণ্ড রয়েছে। ২০১২ সালে রামুর বৌদ্ধ পল্লীতে হামলার পর রামুতে একটানা ১০ দিন অবস্থান করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারে কাজ করেন। পরবর্তীতে ঢাকায় আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ শান্তি সম্মেলন অয়োজনে সদস্য সচিব হিসেবে কাজ করেন তিনি। ২০১১ সালে ঢাকায় আয়োজিত এই বৌদ্ধ মহাসম্মেলনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

বিভিন্ন সামাজিক ও অরাজনৈতিক সেবামূলক সংগঠনের সাথে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া।

উল্লেখ্য গত নির্বাচনে যখন কেন্দ্রীয় নেতাদের সবাই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তখনও তিনি সার্বিকভাবে দলের জন্য কাজ করে যান। তিনি এ সময় নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে ভাবেন নি। এসব কথা জানিয়ে ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, দুটি কারণে আমি সংসদ সদস্য মনোনয়ন ফরম নিইনি। প্রধানমন্ত্রী আমাকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে রেখেছেন। এটা অনেক বড় সম্মান ও স্বীকৃতির ব্যাপার। নির্বাচন তারাই করতে পারে যাদের প্রবল জনভিত্তি আছে। আমার আসনে (সাতকানিয়া-লোহাগড়া) অনেকেই আছেন যারা দীর্ঘদিন ধরে সাংসদ হবার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের অনেক বিনিয়োগ রয়েছে। ওনারা আমার অনেক সিনিয়র। সবাই যদি নির্বাচন করে, তাহলে নির্বাচন পরিচালনার কাজ করবে কারা?

কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় সবাই নির্বাচন করবেন। এসময় দলীয় কার্যালয়ে অনেক কাজ থাকবে। এই কাজগুলো করার জন্য তো লোকজন দরকার বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে এক ব্যক্তি একাধিক পজিশন ভোগ করেন। সাংসদও থাকেন, মন্ত্রীও থাকেন দলের নেতাও থাকেন। দলে অনেক যোগ্য লোক রয়েছেন। আমরা প্রতিটি জায়গায় যোগ্য লোকদের বসাতে চাই। এক লোক যে সব কিছু পাবে, সব কিছু খাবে তা আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি না। এসব কারণে আমি মনোনয়ন নিইনি। তবে তিনি নিজে ছাড়াও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পারভীন জামান কল্পনা, ডা. রোকেয়া সুলতানা মনোনয়ন নেননি বলেন জানান ব্যারিস্টার বিপ্লব।

সারাদিন/২৪ডিসেম্বর/টিআর/আরটি