জেঁকে বসেছে শীত, পরিস্থিতি উত্তরণে সময় লাগবে আরো একদিন

তানভীর রায়হানতানভীর রায়হান
প্রকাশিত: ৩:১৯ অপরাহ্ণ, ২১/১২/২০১৯

ছবি: সারাদিন ডট নিউজ

সারাদেশে জেঁকে বসেছে শীত। সঙ্গে প্রচণ্ড ঘন কুয়াশা। দেশের কয়েকটি এলাকার উপর দিয়ে বয়ে চলা মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শনিবারও (২১ ডিসেম্বর) অব্যাহত ছিল। শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) অবশ্য সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় সামান্য উন্নতি হয়েছে। তবে রাজধানীতে শনিবার (২১ ডিসেম্বর) প্রচন্ড কুয়াশা ও বাতাস বইছে।

এছাড়া সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পার্থক্য কম থাকা, শীতল বায়ু আর মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশায় শুক্রবারও (২০ ডিসেম্বর) সারা দেশের মানুষ অনেক কষ্ট পেয়েছেন। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আরও একদিন সময় লাগবে।

এতে ব্যাহত হচ্ছে বিমান উঠানামা এবং ফেরি চলাচল। শনিবার (২১ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৯ টায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রায় সাড়ে ৪ ঘন্টা বিমান উঠানামা বন্ধ থাকার পরে সাড়ে নয়টা থেকে বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। আর প্রতিটি বিমান চলাচলে তিন বা চার ঘন্টা দেরি হতে পারে বলে সারাদিন ডট নিউজকে জানিয়েছেন হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্দর কর্তৃপক্ষ।

শনিবার (২১ ডিসেম্বর) ভোর থেকে সকাল নয়টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে কয়েকটি ফ্লাইট যথা সময়ে উঠানামা করতে পারেনি। এছাড়া পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে বন্ধ ছিল ফেরি চলাচল। ঘন কুয়াশার কারণে সড়কেও রয়েছে ধীরগতি।

এদিকে নদীতে কুয়াশার ঘনত্ব বেড়ে গেলে ফেরির মার্কিং বাতির আলো অস্পষ্ট হয়ে আসাতে দুর্ঘটনা এড়াতে ভোর ৪টার দিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘন কুয়াশায় ৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফের ফেরি চলাচল শুরু হয়েছে। তবে ঘাটে পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে তিন শতাধিক যানবাহন।

ফেরি চলাচল শুরু হলেও পাটুরিয়া ঘাট পয়েন্টে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে তিন শতাধিক যানবাহন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) পাটুরিয়া সেক্টরের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) জিল্লুর রহমান সারাদিন ডট নিউজকে জানান, ঘন কুয়াশার কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে চার ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। নদীতে কুয়াশার ঘনত্ব কমে যাওয়ায় পুনরায় ফেরি চলাচল শুরু হয়েছে।

নদীতে কুয়াশা কিছুটা কমে যাওয়ায় পুনরায় ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। ঘাট পারের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে তিন শতাধিক যানবাহন। ঘাটে পারাপারের জন্য ১৪টি ফেরি আছে। ঘণ্টাখানেকের ভেতর আটকে থাকা গাড়িগুলো পার করা হবে বলে জানান বিআইডব্লিউটিসির ওই কর্মকর্তা।

কী বলছে আবহাওয়া অধিদপ্তর:

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর শুক্রবার প্রকাশিত পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রাজশাহী, চুয়াডাঙা ও যশোরের ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে হালকা/গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে পূর্বাভাসে।

আবহাওয়া চিত্রের সংক্ষিপ্তসারে বলা হয়েছে, উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ বিহার এবং তৎসংলগ্ন এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে, যার বর্ধিতাংশ উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।

পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার আবহাওয়ার অবস্থায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলেও বর্ধিত পাঁচ দিনের আবহাওয়ায় অবস্থায় দেশের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে হালকা বৃষ্টি অথবা গুড়িঁ গুঁড়ি বৃষ্টি হতে পারে।

শুক্রবারও দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায়, ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন সেখানে তা ছিল ৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি। এছাড়া শুক্রবার যশোরে ৯ ডিগ্রি, রাজশাহীতে ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি, তেঁতুলিয়ায় ১০ দশমিক ১ ডিগ্রি, ঈশ্বরদী, বদলগাছী ও রংপুরে ১০ দশমিক ৩ ডিগ্রি এবং দিনাজপুরে ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। তবে এর বাইরেও অধিকাংশ স্থানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রির মধ্যেই ছিল। এসব স্থানে শুক্রবার প্রায় সারা দিনই সূর্যের মুখ দেখা যায়নি।

সাধারণ মানুষের ভাবনা:

শীতের কারণে সাধারণ মানুষ এখন কাঁতরাচ্ছেন। বিশেষ করে বস্ত্রহীন মানুষ এই শীতে দুর্ভোগে পড়েছেন। শীত নিবারণ করতে আগুন পোহাতে গিয়ে বুধবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়ে ৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

দেশের বিভিন্ন জেলায় শীতজনিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত মানুষ ছুটছেন চিকিৎসকের কাছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাসপাতালে শীতজনিত রোগে ভর্তি বেড়েছে।

শনিবার ঢাকার বঙ্গবাজার, কাকরাইল, খিলক্ষেত, খিলগাও, গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, নিউ মার্কেট, মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে গরম পোশাকের অস্থায়ী দোকানের সামনে স্বল্প আয়ের মানুষের ভিড় দেখা গেছে।

খিলক্ষেতের ফুটপাতে আবুল কাশেম নামের এক দোকানী সারাদিন ডট নিউজকে বলেন, শীতের কারণে গরম কাপড়ের বিক্রি বেড়েছে। আমরা দারুন খুশি এবার আমাদের ভালো বিক্রি হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. একেএম সাইফুল ইসলাম সারাদিন ডট নিউজকে বলেন, মৌসুমের শুরুতে এভাবে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার কথা নয়। আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবেই শৈত্যপ্রবাহ এসেছে। উত্তর মেরু থেকে শীতল বায়ু এবং পৃথিবীর নিম্নাঞ্চলের উষ্ণবায়ু প্রবাহ পরিস্থিতিসহ অন্যান্য কারণে আগামীতে এ ধরনের শৈত্যপ্রবাহ আরও বাড়বে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রাজেশ মজুমদার বলেন, শীতের সঙ্গে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশিসহ নির্দিষ্ট কিছু রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির সম্পর্ক আছে। শীতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় শিশু ও বয়স্করা। তবে শিশুরা প্রস্তুতি বোঝে না বলে তাদের প্রতি বাবা-মাকে বিশেষ যত্ন নিতে হবে।

এদিকে কুয়াশার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। বিশেষ বার্তা প্রকাশ করে তারা সড়কপথে যানবাহন চলাচলে সাবধানতা অবলম্বন করতে চালকদের অনুরোধ জানিয়েছে। প্রয়োজনে দিনেও হেডলাইট জ্বালানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। নৌপথে জাহাজ চলাচলেও সাবধানতা অবলম্বন করতে বলেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ।

সারাদিন/২১ডিসেম্বর/টিআর