সেই লাকী এখন কৃষকদের ন্যায্য অধিকারের কথা বলছে

তানভীর রায়হান:তানভীর রায়হান:
প্রকাশিত: ৫:৫৪ অপরাহ্ণ, ২২/০৮/২০২০

ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী ও গণজাগরণ মঞ্চের স্লোগানের মধ্য দিয়ে লাইম লাইটে উঠে আসে লাকী আক্তার । তবে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি লাকী আক্তার এখন বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। এখন তিনি গ্রামে গঞ্জে চষে বেড়াচ্ছেন কৃষকদের সংগঠিত করতে। কথা বলছে কৃষকদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে।

সব মিলিয়ে কেমন আছে সেই ‘স্লোগান কন্যা’ লাকি। এ বিষয়ে লাকি বিস্তারিত বলেছেন সারাদিন ডট নিউজকে। তাঁর সর্বশেষ খবর পাঠকদের জানাচ্ছেন সারাদিন ডট নিউজের এই বিশেষ প্রতিবেদক।

সারাদিন ডট নিউজ: লাকী আপনি এখন কি করেন? কি নিয়ে ব্যস্ত?

লাকী আক্তার: ছাত্র রাজনীতির পাঠ চুকিয়ে কৃষক রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছি। আমি বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছি।

সারাদিন ডট নিউজ: কৃষি নিয়ে এখন আপনাদের কি কি পরিকল্পনা আছে?

লাকী আক্তার: এই মূহুর্তে বাংলাদেশ কৃষক সমিতি বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করছে। কৃষক সমিতি কৃষকের সমস্যা ও সংকট নিয়ে কাজ করে থাকে। দীর্ঘদিন ধরেই কৃষক যেন ফসলের লাভজনক দাম পায় তার জন্য আমরা কাজ করছি। কৃষকদের শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলে কৃষক আন্দোলনকে গড়ে না তোলা গেলে কৃষকের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি আসবে না। কৃষকরা পরিশ্রম করে কিন্তু কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায় না। সিন্ডিকেটের খপ্পরে পরে বেশি দামে কৃষি উপকরণ কিনে উৎপাদিত ফসল কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষক। এতে দিনদিন কৃষকরা চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছে। বর্তমান সরকার বলছে যে এক খন্ড জমি ফেলে রাখা যাবে না। অথচ কৃষক যে লোকসানে পরে কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছে, তা নিইয়ে কিন্তু সরকারের কোন কথা নেই। এই মহামারি দেখিয়েছে, আমাদের আসলে কৃষির উপরে দাড়াতে হবে। কেননা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি হলো কৃষি। তাই কৃষকই যদি না বাঁচে তবে আমাদের দেশের সার্বিক উন্নয়ন কি করে হবে?

সারাদিন ডট নিউজ: বন্যায় কৃষি ও কৃষকের যে মারাত্মক ক্ষতি হলো এবিষয়ে আপনাদের কৃষক সমিতি কি কি কাজ করেছেন। আর সরকার এই বিষয়ে কি কি করলে আরো ভালো হতো।

লাকী আক্তার: প্রথমত, কৃষকেরা বরাবরই প্রতারিত হন। বছর বছর কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য পাননা। আর দ্বিতীয়ত, একদিকে করোনার ও অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার দরুণ কৃষকরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সেদিকে সরকারের যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেই।

তাছাড়া আমরা বলছি, কৃষিঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার কারণে করা সার্টিফিকেট মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কৃষকদের বিরুদ্ধে করা সার্টিফিকেট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৪৮৫। ২০১৮ সালে এই পাওনা টাকার পরিমাণ ছিল ৫১৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। কৃষক কেন এই ঋণ পরিশোধ করতে পারে না। এর মূল কারণ হলো, কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় ফসলের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ফসলের লাভজনক দাম না পাওয়া ও দুর্যোগের কারণে ফসলহানি। বাংলাদেশ কৃষক সমিতির দীর্ঘদিনের দাবি, সব সার্টিফিকেট মামলা অবিলম্বে বাতিল করে কৃষককে এই ঋণের দায় থেকে মুক্তি দিতে হবে। করোনার এই দুর্যোগে এবং বর্তমান এই বন্যা পরিস্থিতিতে এই ৫০০ কোটি টাকার ঋণ মওকুফই হতে পারত কৃষকের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য প্রণোদনা।

তাছাড়া সরকার সরকারিভাবে পরিচালিত পাটকলগুলোকেবন্ধ করে দিয়েছে। শ্রমিকদের পাশাপাশি এতে বিপাকে পরেছে পাটচাষীরা। এখন পাটের বাজারদর আমরা সর্বনিম্ন মূল্য ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করার দাবি জানাই। তাছাড়া পাটশিল্প বি-রাষ্ট্রীয় করণের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি করছে বাংলাদেশ কৃষক সমিতি। দীর্ঘমেয়াদী আমরা কৃষিভিত্তিক শিল্প আধুনিকরণ ও জাতীয়করণ করা দরকার বলে মনে করি।

আর করোনাকালে আমাদের বেশ কিছু কর্মসূচী ছিল। গত ২২ এপ্রিল আমরা বোরো ধান কাটা, মাড়াই, নিরাপদে ঘরে তোলা, বাজারজাতসহ সার্বিক কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা, খেতমজুরদের ধান কাটার জন্য ফসলের এলাকায় বিনা খরচে যাতায়াত, স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা ও থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্তসহ ১০ লাখ টাকার স্বাস্থ্য বীমা নিশ্চিত, ক্ষেত-মজুরসহ গ্রামীণ মজুর পরিবারগুলোকে সেনা সহায়তায় চিহ্নিত করে তাদেরকে রেশন কার্ডের মাধ্যমে ৩ মাস বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করতে হবে, সকল ঋণ ও কিস্তি (মহাজনি, এনজিও, ব্যাংক ঋণ) মওকুফ , প্রতিটি ইউনিয়নে শস্য ক্রয় কেন্দ্র খুলে চলতি বোরো মৌসুমে ২০ লাখ টন ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ও ১০ লাখ টন চাল চাতাল মালিকের মাধ্যমে সরকার নির্ধারিত দামে ক্রয় করার দাবি,ক্ষুদ্র ও মাঝারী সবজি চাষি, পোল্ট্রি, ডেইরি ও গবাদিপশু খামারিকে রক্ষায় জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা সরাসরি সহায়তা প্রদান ও দুই শতাংশ সরল সুদে ঋণের ব্যবস্থা , সবজি জাতীয় কৃষিপণ্য সরকারি উদ্যোগে বাজারজাত করার ব্যবস্থা, ত্রাণ-সাহায্য বিতরণে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ বন্ধ এবং গ্রামাঞ্চলে কর্মরত সকল ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবহণ শ্রমিক ও ক্ষেতমজুরদের সুরক্ষায় মাস্ক, পিঁপিঁই ইত্যাদির ব্যবস্থা , ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয় কেন্দ্র, খাদ্য গুদাম ও সবজি চাষ অধ্যুষিত অঞ্চলে হিমাগার নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ এইসব দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ কর্মসূচী করেছিলাম।

সারাদিন ডট নিউজ: আপনারা তো অন্যায়ের বিরুদ্ধে মূর্ত প্রতীক ছিলেন। আবারো কোনো অন্যায় থাকলে সরব হবেন কিনা?

লাকী আক্তার: আমরা সব সময় লড়াই করছি, এখনও করছি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থাকাকালীন সময়ে আমরা আন্দোলন করেছি। তারপরে বৃহত্তর পর্যায়ে ছাত্র আন্দোলন করেছি। পরে জাতীয় পর্যায়ের গণ আন্দোলনের সাথে ছিলাম। এখন কৃষি আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছি। এক এক সময়ে লড়াইয়ের ধরন একেক রকম।

সারাদিন ডট নিউজ: আপনাকে তো গণজাগরণ মঞ্চের স্লোগান কন্যা বলা হতো, এখন সেই স্লোগান আমরা আর পাই না কেন?

লাকী আক্তার: স্লোগান রাজনৈতিক আন্দোলনের একটা অংশ। সেটা তো সকল লড়াইয়েই উপস্থিত থাকে। কিন্তু এর ভাষা বদলায়, ডাইমেনশন বদলায়। বিভিন্ন সময়ের আন্দোলনের ভাষা ভিন্ন।

সারাদিন ডট নিউজ: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

লাকী আক্তার: বাংলাদেশে কৃষকের রাজনীতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার কাজ করছি। সেজন্য তৃণমূলে কৃষক সংগঠন গড়ে তুলতে চাই। কেননা কৃষকের মুক্তি আসলেই দেশের মুক্তি সম্ভব। আর রাজনৈতিক লড়াইয়ের কোন বিকল্প নেই।

সারাদিন ডট নিউজ: ধন্যবাদ, আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।

লাকী আক্তার: আপনাকেও ধন্যবাদ

সারাদিন/২২আগস্ট/টিআর