রেলের ৩ কারখানাই অকেজো!

তানভীর রায়হানতানভীর রায়হান
প্রকাশিত: ৬:০৪ অপরাহ্ণ, ১৪/১২/২০১৯

দেশ স্বাধীনের পর থেকে রেলের জনবল সংকট, পর্যাপ্ত অর্থ না পাওয়া ও কাঁচামালের অভাবে রেলের তিন কারখানাাই উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও ধার করা অদক্ষ শ্রমিক লাগিয়ে জোড়াতালি দিয়ে রেলের কাজ এগুচ্ছে বলেও জানান শ্রমিকরা। অপর দিকে ট্রেন, ট্রেনের কোচ, ওয়াগন, বয়লার, পিরিওডিক্যাল ওভারহোলিং (পিওএইচ), জেনারেল ওভারহোলিং (জিওএইচ) ও রক্ষণাবেক্ষণকারী ৩টি কারখানাই এখন অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

এদিকে টাকার অভাব ও দক্ষ লোকবলের অভাবে রেলওয়ের পাহাড়তলী, সৈয়দপুর ও পার্বতীপুরের এ ৩টি কারখানা আগের তুলনায় জনমানব শুণ্য হয়ে পড়েছে। এসব কারখানায় ট্রেন পরিচালনায় যাবতীয় যন্ত্রপাতি মেরামত করাসহ স্টিম রিলিফ ক্রেন ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত রেল কোচ, ওয়াগন ইঞ্জিন মেরামতের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়।

এছাড়া কারখানাগুলোতে ১ হাজার ২০০ রকমের খুচরা যন্ত্রাংশও তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু কাঁচামালের অভাব ও মেয়াদোর্ত্তীণ যন্ত্রাংশের কারণে সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে রয়েছে ৩টি কারখানাই। এমন অবস্থার উত্তরণে কোচ মেরামত-নির্মাণ ও ইঞ্জিন মেরামতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে। পরিস্থিতি এতোটাই উদ্বেগের যে, ধার করা শ্রমিক দিয়ে কারখানাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।

রেলওয়ে সূত্র মতে, ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রেলওয়ের সৈয়দপুর ওয়ার্কশপ। আর চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ওয়ার্কশপের যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৭ সালে। এ দুটি ওয়ার্কশপ রেলওয়ের দুই অঞ্চলে (পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চল) চলা ট্রেনের যেন রক্ষাকবচ।

১৯৯২ সালে চালু করা হয় পার্বতীপুরে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা। এ তিন কারখানার বাইরে রেলের আর কোনো কারখানা নেই। তারপরও দৃশ্যমান আধুনিকায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি এ কারখানাগুলোতে।

একদিকে যেমন কারখানাগুলো কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে, অপরদিকে লোকবল কমছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এরই মধ্যে রেলের যন্ত্রপাতি আর কোচ, ইঞ্জিন, ওয়াগনে আমূল পরিবর্তন আসায় ওয়ার্কশপ তিনটি নতুন ধাঁচে গড়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

কিন্তু এখনও পরিবর্তন আসেনি ওয়ার্কশপগুলোতে। রেল মন্ত্রণালয় ও একটি বেসরকারি সংস্থার সূত্র বলছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে কারখানাগুলো আধুনিকায়ন ও যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়া হলে রেলে বড় বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রামের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (পূর্ব) মিজানুর রহমান সারাদিন ডট নিউজকে বলেন, আমাদের তিনটি কারখানাতে লোকবল সংখ্যা একটু কম। তবে ম্যানুফাকচারিং এ কাজ করার মতো দক্ষ কর্মী নেই। আর আমাদের দেশের এই রেল বিভাগ তো খুবই ছোট। তবে সরকার এখন রেলের প্রতি নজর রেখেছে। কিন্তু বাজেট নেই।

তিনি আরও বলেন, একটি ইঞ্জিল কিনতে অনেক টাকা লাগে। তার বাজেটও সরকারের কাছে নেই। তবে আমাদের আন্তরিকতার বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। তবে বিদেশী সাহায্যে ইঞ্জিন আসছে এটা সত্য কথা। আর আমরা এখনই বললাম আর ওরা এখনই ইঞ্জিন পাঠালো, বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। এটি বানাতে নকশা দিতে হয়। আর বানাতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই বছর। এতো দিন অপেক্ষা না করলে ইঞ্জিন বানানো সম্ভব নয়। তবে আমরা এসব কারণে বিদেশী ইঞ্জিন আনছি।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, সৈয়দপুর ওয়ার্কশপে বছরে প্রায় ৬৫৮ কোচ ও ১ হাজার ৫০০ ওয়াগন মেরামতের সক্ষমতা থাকলেও ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাত্র ১৪৭টি কোচ ও ১৬৮টি ওয়াগন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৩২টি কোচ ও ১৪৮টি ওয়াগন, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১২৬টি কোচ ও ১৫১টি ওয়াগন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১২৬টি কোচ ও ১৪৭টি ওয়াগন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১২৩টি কোচ ও ১১৯টি ওয়াগন মেরামত করা হয়। অথচ ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ওয়ার্কশপটিতে ৩২০টি কোচ ও ২৫৪টি ওয়াগন মেরামত করা হয়েছিল।

এতেই বোঝা যায়- কারখানাগুলোর কার্যক্ষমতা কতটা কমছে। সৈয়দপুরের এ কারখানাটিতে ২ হাজার ৮৩৪ জন জনবলের স্থলে বর্তমানে ১ হাজার ১৩ জন রয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে অবসরে যাবে আরও প্রায় সাড়ে ৫০০ জনবল।

এছাড়া ১৫৬ কর্মকর্তার পদের বিপরীতে কাজ করছেন ৬৬ জন। ৮৪২টি মেশিনের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে ৮৭ শতাংশ মেশিন। মাত্র ১৩ শতাংশ মেশিন মেয়াদের (২০ বছরের মধ্যে) মধ্যে রয়েছে। বাকিগুলোর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর পেরিয়ে ২০০ বছরে গিয়ে ঠেকেছে!

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মুহম্মদ কুদরত-ই-খুদা সারাদিন ডট নিউজকে বলেন, কারখানার সঙ্গে আমাদেরও প্রদীপ নিভু নিভু করছে। তবে, সর্বশক্তি দিয়ে হাজারও স্বল্পতার মধ্যে আমরা কাজ করছি।

তবে সূত্র জানায়, নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় আরও একটি রেলওয়ে কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই কারখানাটিতে তৈরি হবে সম্পূর্ণ রেলওয়ে ক্যারেজ বা কোচ। এরই মধ্যে এর সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার উত্তর পাশে দার্জিলিং গেটসংলগ্ন এলাকায় গড়ে তোলা হবে ওই কোচ নির্মাণ কারখানা। এ জন্য প্রাথমিকভাবে রেলওয়ের ২০ একর জমি এর আওতায় নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে জমির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। রেলের নিজের জমি থাকায় নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না।

সারাদিন/১৪ডিসেম্বর/টিআর