বানারীপাড়ার বধ্যভূমি দুইটি এখনও সংরক্ষন করা হয়নি

দেশের বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদারদের বর্বরতার শিকার নিহতদের গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। আর সেসব স্থানে স্মৃতিসৌধও স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও বরিশাল জেলার বানারীপাড়ায় দুইটি বধ্য ভূমিতে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়নি। এমনকি দুইটি বধ্য ভূমিও সংরক্ষন করা হচ্ছে না।

এই দুইটি বধ্য ভূমির একটি বানারীপাড়ার সদর ইউনিয়নে। আর তাতে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত দক্ষিন গাভা-নরেরকাঠী বাসিন্দারা বাস করে। অপরটি সৈয়দকাঠী ইউনিয়নে। আর তাতে তালাপ্রাসাদ গ্রামের বাসিন্দারা বাস করে। তাদের মুখের সামনে এই দুইটি বধ্যভূমি!

তবে এ দুইটি গণ কবরে রাজাকারদের সহায়তায় পাক বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে হত্যা করে ৯৮ জন শিশু, নারী ও পুরুষের লাশ মাটি চাপা দেয়। যার মধ্যে বধ্য ভূমি অনুসন্ধানে নিয়োজিতরা ৬১ জনের নাম পরিচয় সনাক্ত করতে পেরেছেন। বাকিদের নাম ঠিকানা সংগ্রহে অনুসন্ধান চলছে।

২০১০ সালে গাভা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক সুখরঞ্জন সরকার বরিশাল জেলা প্রশাসকের কাছে গণহত্যার শিকার ওই সব লাশের স্মৃতি রক্ষার্থে আবেদন করেন। পরে তদন্তে গণ কবর দুইটি চিহ্নিত করা হয়। চিহিৃত করা হলেও আজও সংরক্ষন করা হয়নি বানারীপাড়ার বধ্যভূমি দুইটিকে।

তবে এলাকাবাসীরা জানান, স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা যেহেতু রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন সেহেতু বধ্যভূমি দুইটি সংরক্ষন করে স্মৃতি স্তম্ভ নির্মান করে আত্ম উৎসর্গকারী শহীদদের স্মৃতি রক্ষা করা হবে। কিন্তু এলাকাবাসী ও শহীদ পরিবারের স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল।

আর চিহিৃত করার পরে ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও গণহত্যার শিকার শহীদদের নামের তালিকাটি পর্যন্ত টানানোর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তবে ২০১২ সালের ১৩ মে আওয়ামী লীগের তৎকালীণ সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল ইসলাম মনি গাভা-নরেরকাঠি বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়ে সেখানে ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।

এছাড়া দূর্গম ওই বধ্য ভূমিতে যাতায়াতের সুবিধার্থে তিনি আলতা, রায়েরহাট ও গাভা বাজার থেকে বধ্যভূমি পর্যন্ত পাকা রাস্তা ও বধ্যভূমির পাশে নতুন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে ভবন নির্মাণ করেন। তবে বধ্যভূমি লাগোয়া ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পর্যন্ত চালু করা হয়নি।

বর্তমান সংসদ সদস্য শাহে আলম সারাদিন ডট নিউজকে জানান, তিনি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বধ্যভূমি পরিদর্শণ করে সেখানে আধুনিক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে দিয়ে এর নকশাও তৈরী করা হয়েছে। শিগগিরই এর উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হবে।

পাক হানাদারদের বর্বরতার সেই মর্মস্পর্শী ঘটনা প্রসঙ্গে পাকবাহিনীর বর্বরতার প্রত্যক্ষদর্শী গাভা গ্রামের বয়োবৃদ্ধ যাদব চন্দ্র হাওলাদার সারাদিন ডট নিউজকে জানান, ৭১ সালের ২ মে দুপুর ২ টা-আড়াইটার দিকে গাভা বাজার ও রায়ের হাট এলাকা থেকে দুই দল পাক সেনা এসে গাভা-নরেরকাঠী গ্রামের লোকজনদের ধরে ধরে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে খালের পাড়ের জমিতে লাইন দিয়ে দাড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে। প্রায় ২০-২৫ মিনিট তারা পাখি শিকারের মত গুলি বর্ষণ করে। সবার মৃত্যু নিশ্চিত হলে আনন্দে বর্বর পাক সেনারা ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে উল্লাস করে। পিপাসার্ত পাষন্ড পাক সেনাদের ডাবের পানি খাইয়ে পিপাসা মিটিয়েও সেদিন তাদের হাত থেকে এলাকার লোকজন বাঁচতে পারেনি। পাক সেনারা গানবোট ব্যবহার না করে পায়ে হেটে ওই স্থানে আসায় আকস্মিকতায় পালাতে পারেনি এলাকার লোকজন। নিহতদের অনেকের লাশ পানিতে ভেসে যায়। আতঙ্কে এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে।

জমি ও খালের পাড়ে প্রায় এক সপ্তাহ পড়ে থাকা লাশগুলো দুর্গন্ধ ছড়িয়ে শিয়াল, শকুন ও কুকুরের খাদ্যে পরিণত হয়। এ দৃশ্য দেখে অনেকটা সাহস নিয়ে ওই এলাকার যাদব হাওলাদার প্রহ্লাদ সমদ্দার, গেরদে আলী সিকদার ও সুধীর রায় সহ কয়েকজন যুবক মিলে শিশু নারী ও পুরুষের ৯৫ টি লাশ মাটি চাপা দেয়। এদিকে বধ্য ভূমি দু’টি সংরক্ষন করে শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ নির্মানের দাবী জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও শহীদদের পরিবার।

সারাদিন/১৪ডিসেম্বর/টিআর