আজ (১৩ ডিসেম্বর) মানিকগঞ্জ হানাদার মুক্ত দিবস

আজ শুক্রবার ১৩ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিন পাক বাহিনী মানিকগঞ্জের মাটি ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরের দিন ১৪ ডিসেম্বর সকালে দেবেন্দ্র কলেজ মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন এমএনএ আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মাযহারুল ইসলাম চাঁন মিয়া। দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে মানিকগঞ্জে শহীদ হন ৫৮ জন মুক্তিযোদ্ধা।

২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় ক্র্যাক-ডাউনের খবর পাওয়ার পর পরই তৎকালীন অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি বিপ্লবী পরিষদ গঠন করে মানিকগঞ্জের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

ওই রাতেই পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মানিকগঞ্জের ট্রেজারিতে রক্ষিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ বের করে ছাত্র ও যুবকদের মাঝে বিতরণ করা হয়। পরের দিন থেকে ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর আলুর গুদামের পেছনে শুরু হয় অস্ত্র প্রশিক্ষণ। এরপর থেকে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে পাক বাহিনীর বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়। এরমধ্যে গোলাইডাঙ্গা, সূতালড়ি, আজিমনগর, বায়রা, নিরালী সাটুরিয়া, নারচি, বালিরটেক, গাজিন্দা, মানরাসহ বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ হয়।

২৬ মার্চ ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বে মানিকগঞ্জ ট্রেজারির তালা ভেঙে অস্ত্র লুট করে তা বিতরণ করা হয় ছাত্র-জনতার মাঝে। ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেন। মানিকগঞ্জ সিঅ্যন্ডবির ডাক বাংলো ছিল পাক হানাদার বাহিনীর সদর দফতর। এখান থেকেই হানাদার এবং তাদের দোসররা নিধনযজ্ঞ পরিচালনা করতো। আর মূল ব্যারাক ছিল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন পিটিআইয়ের (প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট) মূল ভবনে।

তবে গোলাইডাঙ্গার যুদ্ধ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সব চাইতে সফল যুদ্ধ। গোলাইডাঙ্গার খালের কুমে এই যুদ্ধে ৮২ জন পাক হানাদার ঘটনাস্থলে মারা যায়।

পাক বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের আরেকটি দৃষ্টান্ত তেরশ্রী ট্রাজেডি। ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামে ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর পাক হানাদার বাহিনী হামলা চালিয়ে তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান এবং শিক্ষানুরাগী তেরশ্রী গ্রামের জমিদার সিদ্ধেশ্বর রায় প্রসাদ চৌধুরীসহ হত্যা করে ৪৩ জন গ্রামবাসীকে।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মানিকগঞ্জে শহীদ হয়েছেন ৫৪ জন মুক্তিযোদ্ধা। পঙ্গু হন ৯ জন বীরসেনা। যুদ্ধে অবদানের জন্য বিভিন্ন খোতাবপ্রাপ্ত হয়েছেন চারজন মুক্তিযোদ্ধা। তারা হলেন, স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) বদরুল আলম (বীর প্রতীক), ইব্রাহীম খান (বীর প্রতীক), শহীদ মাহফুজুর রহমান (বীর প্রতীক) এবং মোহাম্মদ আতাহার আলী খান (বীর প্রতীক)। তাদের মধ্যে একমাত্র আতাহার আলীই বর্তমানে জীবিত আছেন।

১৩ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জে চুড়ান্ত বিজয় হলেও, তারও আগে থেকে বিভিন্ন উপজেলা ছাড়তে থাকেন হানাদার বাহিনী। শত্রুমুক্ত হওয়ার পর ১৩ ডিসেম্বর বিজয়ী বেশে মুক্তিযোদ্ধারা সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ মাঠে সমবেত হন। আওয়ামী লীগ নেতা মাজহারুল হক চাঁন মিয়া ওই দিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। পরে তার সভাপতিত্বে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই মুক্তি বাহিনীর আক্রমণে পাক সেনারা মানিকগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পিছিয়ে আসতে শুরু করে। ১৩ ডিসেম্বরের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা হামলায় পাক বাহিনী মানিকগঞ্জ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছরের মতো এবারো ১৫ দিনব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা শুরু হচ্ছে আজ থেকে। আজ প্রথম প্রহরে ১২.১ মিনিটে মশাল জেলে বিজয় মেলার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক এস.এম ফেরদৌস ও মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগ এর সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা গোলাম মহীউদ্দীন।এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামীলীগ এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুলতানুল আজম খান আপেল,মানিকগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক কাজী জুনাইদ হোসেন প্রতীক,মানিকগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক রিপন আলী সহ অনেকে।

এসময় মানিকগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক কাজী জুনাইদ হোসেন প্রতীক বলেন,বিজয় মেলার মাধ্যমে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত হবে।

সারাদিন/১৩ ডিসেম্বর