খোলা ময়দানে ঈদের জামাত হচ্ছে না, তদারকি হবে কিভাবে

বিশেষ প্রতিবেদকবিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৪:০০ পূর্বাহ্ণ, ২৩/০৫/২০২০

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে এবারের ঈদের নামাজ ঈদগাহ বা খোলা জায়গার পরিবর্তে বাড়ির কাছের মসজিদে গিয়ে আদায় করার জন্য অনুরোধ করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।র গত ১৪ই মে আলেম-ওলামাদের সঙ্গে বৈঠক করে ধর্ম মন্ত্রণালয় একটি পরিপত্র জারি করে। সেখানে মসজিদের ঈদের নামাজ আদায়ের ব্যাপার এ সংক্রান্ত কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে জামাত শেষে কোলাকুলি এবং পরস্পর হাত মেলানো পরিহার করার জন্যও অনুরোধ করে ধর্ম মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “বর্তমানে সারা বিশ্বসহ আমাদের দেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিজনিত ওজরের কারণে মুসল্লিদের জীবনের ঝুঁকি বিবেচনা করে এ বছর ঈদগাহ বা খোলা জায়গার পরিবর্তে ঈদের নামাজের জামায়াত নিকটস্থ মসজিদে আদায় করার জন্য অনুরোধ করা হল। প্রয়োজনে একই মসজিদে একাধিক জামায়াত অনুষ্ঠিত হবে।”

মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ ময়দান কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় কোন ঈদুল ফিতরের জামাত আয়োজন করা হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান জানান, কিশোরগঞ্জের স্থানীয় সাহেব বাড়ির বংশধর সৈয়দ আহমদ ১৮২৭ সালে প্রথমে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

সে সময়ে তিনি পীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন এর পরের বছর অর্থাৎ ১৮২৮ সালে এই মাঠের গোড়াপত্তন হয় এবং সৈয়দ আহমদ ওই বছর তার ইমামতিতে প্রথম ঈদের জামাত শুরু করেন। কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্বে নরসুন্দা নদীর তীরে প্রায় সাত একর জমির ওপর এ ঈদগাহটি বিস্তৃত করা হয়।

কথিত আছে পরবর্তীতে ঈসা খাঁর বংশধর দেওয়ান মান্নান দাদ মাঠের পরিধি বাড়ান। মি. আখতারুজ্জামান বলেন, সৈয়দ আহমেদের বাবা সৈয়দ ইব্রাহীম ১৮শ শতকে ইয়েমেন থেকে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন বেশ ধর্মপরায়ণ এবং ভারতের ২৪ পরগনায় ইসলাম প্রচার করতেন। এছাড়া ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন বলে জানা গেছে।

পরে কিশোরগঞ্জে ধর্মপ্রচার করতে গিয়ে তিনি সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সাহেব বাড়িতে একটি মাজার স্থাপন করেন। যা বড় পীরের মাজার নামে পরিচিত। মাঠের নামকরণের বিষয়ে জনশ্রুতি আছে যে, এই মাঠে প্রথম ঈদের জামাতে ১ লাখ ২৫ হাজার অর্থাৎ সোয়া লাখ মুসল্লির জমায়েত হয়েছিল।

সেই থেকে মাঠের নাম হয়ে যায় ‘সোয়া লাখি মাঠ’। সেখান থেকে উচ্চারণের বিবর্তনে এই মাঠের নাম বদলে শোলাকিয়া হয়েছে। জাতীয় তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী অপর একটি ধারণা হচ্ছে, মোগল আমলে এখানে পরগনার রাজস্ব আদায়ের একটি অফিস ছিল। সেই অফিসের রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। জনশ্রুতি হচ্ছে, এটাও ”শোলাকিয়া” নামকরণের উৎস হতে পারে।

গত কয়েক বছর ধরে এই মাঠে একসাথে তিন লাখেরও বেশি মানুষ ঈদের জামাতে অংশ নিয়ে আসছেন। জেলা ও জেলার বাইরে থেকে আসা লাখ লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণের কারণে এই জামাত, ঈদের অন্যতম আকর্ষণ।

এবার ঐতিহাসিক এই ঈদগাহে ১৯৩তম ঈদুল ফিতরের বড় জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। অথচ এবারই প্রথম এখানে কোন জামাত অনুষ্ঠিত হবে না। এদিকে ঢাকার জাতীয় ঈদগাহ ময়দান, সিটি কর্পোরেশনের মাঠে নিয়মিত যে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতো। সেটাও এবার হচ্ছে না।

ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, এবার সব মুসল্লি যেন মসজিদে ঈদের জামাতে অংশ নিতে পারে সেজন্য মসজিদে জামাতের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। চট্টগ্রামে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ ময়দানে। কিন্তু এবার মাঠে ময়দানে ঈদের জামাতের আয়োজন রাখা হচ্ছে না।

মুসল্লিরা যেন যার যার এলাকার মসজিদে নামাজ আদায় করেন সেই বিষয়টি মনিটর করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার এ বি এম আজাদ।

রাজশাহীতে ঈদ উল আজহার প্রধান ও বৃহত্তম জামাত অনুষ্ঠিত হয় হজরত শাহ্ মখদুম (রহ:) কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে। অন্যদিকে রংপুরে ঈদের প্রধান জামাত হয় কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে।
সেখানকার মুসল্লিরা যাতে মসজিদগুলোয় নামাজ আদায় করেন সেটা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন।

খুলনায় ঈদের নামাজের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় টাউন জামে মসজিদ ময়দানে। এছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কুয়েট, মহানগরীর ৩১টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন ঈদগাহে জামাত হয়ে থাকে।

কিন্তু এবারে বিভাগের অধিকাংশ জেলা ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে ঈদের জামাত যেন সরকারি নির্দেশমতো হয় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মো. আনোয়ার হোসেন।

একইচিত্র বরিশালে। উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে যাওয়ায় সেখানকার ঈদের আমেজ অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে। এখানে প্রতি বছর ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় হেমায়েত উদ্দিন ঈদগাহে। বিভাগীয় কমিশনার মো. ইয়ামিন চৌধুরী এবার প্রতিটি মসজিদে একাধিক জামাত বসানোর অনুরোধ করেছেন।

এ বিষয়ে জেলা উপজেলা পর্যায়ে প্রচারণা চালানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে মুসল্লিরা নামাজ আদায়ের সময় যেন দূরত্ব বজায় রেখে সে বিষয়েও তারা স্থানীয়দের সতর্ক করেছেন। সিলেটে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ ময়দানে। কিন্তু এবার সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ মসজিদে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হতে পারে।

এছাড়া প্রতিটি মসজিদে প্রয়োজন অনুযায়ী জামাত সংখ্যা বাড়াতে ইমামদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে মসজিদগুলো থেকে কার্পেট সরিয়ে নেয়া হবে। দুই জামাতের মাঝে মেঝে পরিষ্কার করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। সব মুসুল্লিদের মাস্ক পরে আসতে বা নিজেদের জায়নামাজ নিয়ে আসতে বলা হয়েছে।

ময়মনসিংহের কোথাও খোলা ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে না। সব মুসুল্লিরা যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারেন সে ব্যাপারে ইমামদের নির্দেশনা দেয়া আছে বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার খন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান। এছাড়া জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বিষয়গুলো মনিটর করবে বলেও তিনি জানান-সূত্র বিবিসি বাংলা।

সারাদিন/২৩মে/ আরটিএস