ছয় মাসে চাকরিচ্যুত ৪৫০ টিভি সংবাদকর্মী

সারাদিন ডেস্কসারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:৫০ অপরাহ্ণ, ১২/১২/২০১৯

দেশের বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদকর্মীরা চাকরি হারাচ্ছেন৷ গত ছয় মাসে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের কমপক্ষে ৪৫০ জন চাকরি হারিয়েছেন৷ অভিযোগ কোনো নিয়ম নীতি না মেনেই তাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে৷

সম্প্রতি ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করেছেন এসএ টিভির সংবাদকর্মীরা৷ তারা মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন৷ তাদের এই আন্দোলনের সঙ্গে আছে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)৷ টেলিভিশন সাংবাদিকদের সংগঠন ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারও (বিজেসি) আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে৷

এসএ টিভির আন্দোলনকারীদের পক্ষে সাংবাদিক মোহসিন কবীর বলেন, ‘গত সাত বছরে আমাদের ৫০০ কর্মী থেকে ছাঁটাই করে ২৫০ জনে নামিয়ে আনা হয়৷ এরপর সর্বশেষ আরও ১৮ জনকে ছাঁটাই করায় কর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে শনিবার থেকে আন্দোলন শুরু করেন৷ তারা গুলশানের টেলিভিশন কার্যালয়ের একটি গেটে তালা লাগিয়ে দেন৷ দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে৷’

তিনি বলেন, ‘শুধু ছাঁটাই নয়, গত চার মাস ধরে আমাদের বেতন নেই৷ সাত বছর আগে টেলিভিশনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে কোনো ইনক্রিমেন্ট বা পদোন্নতিও দেয়া হয়নি৷ আর সম্প্রতি টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ প্রায় সবাইকে ছাঁটাই করে কম বেতনে নতুন লোক নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল৷’

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু জাফর সূর্য বলেন, ‘আমাদের সাথে এর আগে এসএ টিভির সাথে বৈঠক হয়েছে৷ তারা ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করেছেন৷ কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করে আবার ছাঁটাই শুরু করেছে৷ কিন্তু আমরা ১৩ দফা আদায় করে ছাড়ব৷ কাউকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা যাবে না৷’

এসএ টিভির ঘটনা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খ ম হারুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকার বাইরে আছি৷ তবে ঘটনা শুনেছি৷ কিন্তু পুরো ঘটনা সম্পর্কে ঢাকায় ফিরে আসার আগে বলা সম্ভব নয়৷’

আবু জাফর সূর্য বলেন, ‘ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্য কোনো সরকারি নীতিমালা নেই৷ নিয়োগ এবং চাকরিচ্যুতিতে কোনো নিয়ম মানা হয় না৷ তাই সেখানে অস্থিরতা বিরাজ করছে৷ আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে তাতে গত ৬-৭ মাসে এই সেক্টরের চারশ থেকে সাড়ে চারশ কর্মী চাকরি হারিয়েছেন৷ এই চাকরি হারানোদের মধ্যে সাংবাদিক ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগের কর্মী রয়েছেন৷আরও অনেক কর্মী চাকরি হারনোর আতঙ্কে আছেন৷’

ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি) বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ওপর সম্প্রতি একটি জরিপ পরিচালনা করেছে৷ তাতে দেখা গেছে ১৮টি চ্যানেলে নিয়মিত বেতনবৃদ্ধি হয় না৷ ১০টি চ্যানেলে চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে৷ তিন থেকে ছয় মাস বেতন হয় না এরকম চ্যানেলের সংখ্যা সাত থেকে ১০টি৷

বিজেসি এর সদস্য সচিব এবং একাত্তর টিভির হেড অব নিউজ শাকিল আহমেদ বলেন, ‘গত এক বছরে আমরা যদি দেখি তাহলে একটি চ্যানেলের পুরো বার্তা বিভাগই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে৷ ফলে ওই একটি চ্যানেল থেকেই কমপক্ষে ১২০ জন কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে৷ আরও নয়টি চ্যানেল থেকে জনবল ছাঁটাই করা হয়েছে৷ ফলে ছাঁটায়ের সংখ্যাটি কম নয়৷ আর সব সময়ই ছাঁটাই আতঙ্ক চলছে৷ সংখ্যার চেয়ে যেটা আরও বেশি আতঙ্কের তা হলো যারা অভিজ্ঞ এবং এ কারণে যাদের বেতন বেশি তারা এই ছাঁটাইয়ের কবলে পড়ছেন আগে৷ অর্থাৎ যারা ভালো কাজ করেন তারা সর্বোচ্চ জায়গায় যেতে পারবেন না৷ আমরা বলছি অন্যায়ভাবে কাউকে চাকরিচ্যুত করা যাবে না৷ কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেটা ভিন্ন বিষয়৷’

এই সংকটের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেকগুলো টেলিভিশনের লাইসেন্স দিয়ে দেয়া হয়েছে৷ কিন্তু শিল্প সুরক্ষার বিষয়টি একেবারেই দেখা হয়নি৷ টেলিভিশনগুলো কিভাবে ইনকাম করবে তার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নাই৷ এখানে যারা কাজ করবেন তাদের বেতন কাঠামো, মানোন্নয়ন কীভাবে হবে কোনো কিছু ঠিক না করেই টেলিভিশন শুরু করা হয়েছে৷ এখানে আকাশ উম্মুক্ত৷ বিদেশি টেলিভিশন অবাধে দেখা যায়৷ বিজ্ঞাপন বিদেশে চলে যায়৷ সরকার সম্প্রতি কিছু উদ্যোগ নিয়েছে৷ বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন বন্ধে কঠোর হয়েছে৷ গণমাধ্যমকর্মী আইন করতে চাইছে৷ পে- চ্যানেল করারও উদ্যোগ নিয়েছে৷ যদি এভাবে শিল্প সুরক্ষা নিশ্চিত হয় তাহলে বাংলাদেশে ৩০টি কেন, ৫০টি টেলিভিশনও চলতে পারবে বলে আমি মনে করি৷’

বাংলাদেশে এখন ৩০টি বেসরকারি টেলিভিশন চালু আছে৷ তথ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে ৪৪টি চ্যানেলকে৷ আরও কয়েকটি চ্যানেল লাইসেন্স পাওয়ার অপেক্ষায় আছে৷

ডিইউজের সভাপতি বলেন, ‘শুধু বেসরকারি টেলিভিশন নয়, অনলাইন নিউজ পোর্টালের কোনো নীতিমালা নেই৷ সেখানে নানা রকম সমস্যা তৈরি হচ্ছে৷ বেশ কিছু সংবাদপত্রেও ছাঁটাই হয়েছে৷ এর বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলনে আছি৷’ –ডয়চে ভেলে

সারাদিন/১২ ডিসেম্বর/আর