পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার অ্যাডা লাভলেস

নিউজ ডেস্কনিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩:০১ অপরাহ্ণ, ১১/১২/২০১৯

মাধ্যমিকে পড়ার সময় প্রথম কম্পিউটার প্রোগামার অ্যাডা লাভলেস সম্পর্কে জানার কথা। বিখ্যাত ব্রিটিশ কবি লর্ড বায়রনের কন্যা হিসেবে না হলেও তিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামার। তবে এই মহিয়সী নারীর সম্পর্কে অধিকাংশের জ্ঞানই কম্পিউটার শিক্ষা বইয়ের দু-চার লাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

১৯৩৫-৩৬ সালে প্রথম আধুনিক কম্পিউটার নির্মিত হবারও ১০০ বছর আগে, যখন কম্পিউটার শব্দটা শুধু বিমূর্ত ধারণাই দিত, তখন কম্পিউটার বিজ্ঞানী হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে পারা চাট্টিখানি কথা তো নয়! এই কঠিন কাজকে কীভাবে নিজের সংক্ষিপ্ত জীবনে বাস্তবায়িত করলেন অ্যাডা লাভলেস, তা-ই জানবো আজ।

১৮১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন অগাস্টা অ্যাডা বায়রন। লাভলেস মূলত বিয়ের পর তার পরিবর্তিত বংশনাম।

১৮৩৫ সালে আর্ল অব লাভলেস, উইলিয়াম কিং কে বিয়ে করেন অ্যাডা বায়রন। সেই থেকে তার বায়রন প্রতিস্থাপিত হয় লাভলেস দ্বারা। ১৮৩৬-৩৯ সালের মধ্যে তার গর্ভে আসে ৩টি সন্তান। ঘন ঘন সন্তান জন্মদান এবং তাদের পরিচর্যায় ব্যস্ত অ্যাডার এ সময়টা কেটে যায় গাণিতিক জগতের বাইরে।
১৮৪১ সালের দিকে চার্লস ব্যাবেজ ডিফারেন্স ইঞ্জিনের চেয়ে অধিকতর আধুনিক এবং জটিল কম্পিউটার ‘অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন’ এর ধারণা উপস্থাপন করেন। কম্পিউটারের ইতিহাসে এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক অধ্যায়। তবে অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিনের ধারণা সে সময়ের সাপেক্ষে এত অগ্রসর ছিল যে অধিকাংশের জন্যই তা বোধগম্য হচ্ছিল না।

কোনো এক লুইজি মেনাব্রিয়া নামক ফরাসি ব্যক্তি ব্যাবেজের লেকচার এবং অন্যান্য তথ্যের উপর ভিত্তি করে রচনা করলেন ‘দ্য স্কেচ অব চার্লস ব্যাবেজ’স অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন’। ফরাসি ভাষায় রচিত এই বইয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যাবেজের পরিকল্পনাকে সহজভাবে উপস্থাপন করা। অ্যাডা এই বইটিকে ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন। তার অনুবাদ এতটাই প্রাঞ্জল হয় যে, ব্যাবেজ তাকে এরকম একটি কাজ নিজে থেকে করার জন্য অনুপ্রেরণা দেন। এই অনুপ্রেরণা বৃথা যায়নি। দু’বছরের মধ্যে বইটির দ্বিতীয় ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করেন অ্যাডা, যেখানে মূল বইয়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি নিজস্ব নোট যোগ করেন তিনি!

আজকের যুগের আধুনিক কম্পিউটারের ধারণা প্রবর্তনে ব্যাবেজের পাশাপাশি অ্যাডার ভূমিকাও অপরিসীম। অ্যালগরিদম রচনা করে তিনি অনুধাবন করেন যে, অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন কেবল গণনাযন্ত্র হিসেবে নয়, ব্যবহৃত হবে আরো অসংখ্য কাজে। তিনি তার নোটে লিখেছিলেন, যে কোনো বিষয় যেমন গান, ছবি ইত্যাদিকে যদি সংখ্যায় পরিণত করার উপায় খুঁজে বের করা যায়, তাহলে কম্পিউটারের মাধ্যমে তার পরিবর্তন করা সম্ভব।

Nagad

আজ আমরা জানি যে, সে উপায়টি হচ্ছে বাইনারি সংখ্যা। অ্যাডা লাভলেসকে তাই ধন্যবাদ না দিলেই নয়। তার জন্যই কম্পিউটার প্রথম ‘কেবল গণনাযন্ত্র’ পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসে। তাই অনেক সময় মনে প্রশ্ন এসেই যায়, চার্লস ব্যাবেজকে যদি আধুনিক কম্পিউটারের জনক বলা যায়, তাহলে অ্যাডা লাভলেসকে কেন আধুনিক কম্পিউটারের জননী বলা যাবে না! অবশ্য, জননী শব্দটির ব্যবহার নেই কোথাও। তাতে কী? অ্যাডার অবদানের কথা মাথায় রেখে এর প্রচলন করাই যেতে পারে।

চার্লস ব্যাবেজ আর অ্যাডা লাভলেস যখন দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছেন কম্পিউটার বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিপ্লব ঘটানোর দিকে, তখন পিছুটান হয়ে আসে অ্যাডার স্বাস্থ্য। যুগান্তকারী অ্যালগরিদম রচনার কিছুকাল পরই ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। বেশ কয়েকবছর যাবত জরায়ুর ক্যান্সারে ভোগেন তিনি, যদিও তখনকার অনুন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞান তার রোগ সঠিকভাবে নির্ণয়ই করতে পারেনি।

তার অবস্থার ক্রমাগত অবনতি দেখে ডাক্তাররা তার উপর গ্যালেনের ‘রক্তক্ষরণ’ পদ্ধতিও প্রয়োগ করে! এতে করে তার মৃত্যুটা বরং আরো ত্বরান্বিতই হয়েছিল। ১৮৫২ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল মাত্র ৩৬ বছর।

অ্যাডা লাভলেসের মৃত্যুতে সব ওলট পালট হয়ে যায়। তার অ্যালগরিদম বিষয়ক কাজ স্থবির হয়ে যায়, অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হন ব্যাবেজ। ফলে অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন আর কোনোদিন আলোর মুখ দেখেনি।

সারাদিন/১১ডিসেম্বর/