ধোলাইখালে শিল্প

প্রকৌশলীদের সাহায্যে ধোলাইখাল হতে পারে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন

বিশেষ প্রতিনিধিবিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৪:৪৯ অপরাহ্ণ, ১৬/১১/২০১৯

প্রকৌশলীদের সাহায্যে ও ধোলাইখালের শ্রমিকদের অভিজ্ঞতায় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পুরান ঢাকার ধোলাইখালে শিল্প বিপ্লব হওয়ার সম্ভাবনা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সরকার তাদেরকে কোনো সুযোগ সুবিধা দেয় না। অথচ তাদেরকে নিয়ে চাকরী দেয় বিদেশের ব্যবসায়ীরা। সেখানেও তারা সফল ভাবে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান। কিন্তু ধোলাইখালের শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা না দিলে এই শিল্প ধ্বংস হবে। তার ফলে বাংলাদেশ সরকারও বঞ্চিত হবেন।

গাড়ির ছোটখাটো যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী এক প্রতিষ্ঠানের স্বত্ব্বাধিকারী সোহরাব হোসেন বলেন, ধোলাইখালে উৎপাদিত পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। কয়েক বছর আগে একটি চুক্তি অনুযায়ী নিউ মিলবার্ট ইন্টারন্যাশনাল ১৫ হাজার ডলারের বাম্পার ব্রাকেট, রাবার ব্রাশ ও সাসপেনশন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছিল। প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে সেই চুক্তি অনুযায়ী রপ্তানি শুরু না হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও আজারবাইজানসহ বিশ্বের বহুদেশে রপ্তানি হচ্ছে ধোলাইখালের তৈরি মেশিনারিজ পণ্য।

তিনি আরো বলেন, সরকার যদি আমাদের ঋণ দিতো তবে অনেক ভালো হতো। আবার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এখানে নিয়ে এসে আমাদের অভিজ্ঞতায় তাদের ও আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি আমরা খুব ভালো ভাবে দেশেই সব কিছু তৈরি করতে পারতাম। কিন্তু সরকার আমাদের প্রতি আন্তরিক নয়। তাই আমাদের এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভবপর হচ্ছে না।

রানা নামের এক কর্মচারী বলেন, মালিক, কর্মচারী, কারিগর মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ তাদের জীবিকার জন্য ধোলাইখালের উপর নির্ভরশীল। ধোলাইখালের কারিগররা এখানে কাজ করতে করতে একসময় নিজেরাই দোকানের মালিক হন। এদের দক্ষতা অবিশ্বাস্য। প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি শিক্ষা দেয়া গেলে এরা বিশ্বমানের মোটর মেকানিক হবার যোগ্যতা রাখে।

সংশ্লিষ্টরা আরো বলেন, ধোলাইখালের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। দেশকে শিল্পক্ষেত্রে এগিয়ে নিতে হলে ধোলাইখাল ও জিঞ্জিরার অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের কাজে লাগাতে হবে। শিল্পায়নের বিকাশে স্বল্প সুদে ঋণসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পুরনো ঢাকায় নবাবপুর রোডের মোড় থেকে নারিন্দা পর্যন্ত এই ধোলাইখালের বাজারের বিস্তৃতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই ধোলাইখালে পুরোনো যন্ত্রাংশের ব্যবসা শুরু হয়। এখানে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় হাজার পাঁচেক খুচরা ও পাইকারী যন্ত্রাংশের দোকান রয়েছে। মোটর পার্টসের দোকান ছাড়াও এখানে রয়েছে ড্রাম শিট, লেদ মেশিন, পুরনো লোহা লক্কড়ের দোকান।

সেখানে ঘুরে আরো দেখা গেছে, ধোলাইখালে মূলত বিক্রি হয় মোটরগাড়ির যন্ত্রাংশ। পুরনো নতুন সব ধরনের যন্ত্রাংশই এখানে পাওয়া যায় তবে পুরনো যন্ত্রাংশই বেশি। বডি থেকে শুরু করে টায়ার পর্যন্ত গাড়ির প্রতিটি যন্ত্রাংশই এখানে খুঁজে পাবেন। ঢাকার অন্যান্য জায়গায় গাড়ির নতুন যন্ত্রাংশ পাওয়া গেলেও মানুষ সাধারণত ধোলাইখালে আসে কারণ এখানে রিকন্ডিশন্ড যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়; দাম নতুনের থেকে অনেক কম।

ধোলাইখালের আরেকটি সুবিধা হলো কোন যন্ত্রাংশ কেনার পর সেটা আপনার গাড়িতে ফিট করার জন্য কারিগর সেখানেই পেয়ে যাবেন। প্রতিটি দোকানেই একজন দু’জন কারিগর থাকে তারা দোকান থেকে যন্ত্রাংশ কেনার পর তা গাড়িতে লাগিয়ে দিতে সাহায্য করে।

ক্রেতারা অনেক সময় প্রতারণারও শিকার হন এখানে। গাড়ির যন্ত্রাংশের দাম সম্পর্কে ধারণা না থাকলে ক্রেতাকে পড়তে হতে পারে বিপাকে। কারণ বিক্রেতারা কোনও যন্ত্রের দাম চাইতে পারে ন্যায্যমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে যন্ত্রাংশ কেনার সময় সঙ্গে এমন কাউকে নিয়ে যাওয়া উচিত যার ধোলাইখালের দাম সম্পর্কে ধারণা রয়েছে।

রিকন্ডিশন্ড এই খুচরা যন্ত্রাংশগুলো তারা আমদানি করে চীন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর থেকে। এখানে প্রায় সব মডেলের গাড়ির বিশেষ টয়োটা, নিশান, হোন্ডা, মিৎসুবিশি, সুজুকি, মারুতির যন্ত্রাংশ বেশি পাওয়া যায়। বাস এবং ট্রাকের মধ্যে বেড ফোর্ড, ইসুজু, নিশান, হিনো, ভলভো, টাটা, অশোক লেল্যান্ড, টারসেল, আইয়ার, ক্যান্টার প্রভৃতি গাড়ির যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়।

জানা গেছে, এসব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ শিল্প গৃহস্থালি, কৃষি, বৈদ্যুতিক, যানবাহন, খেলনা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহূত হচ্ছে। ধোলাইখালে তৈরি সামগ্রীর মধ্যে আছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মডেলের গাড়ির পার্টস, লাইনার, বিয়ারিং, ব্রেকড্রাম, ইঞ্জিন, কার্টিজ, সকেট, জগ, জাম্পার, স্প্রিং, হ্যামার, ম্যাকেল জয়েন্ট, বল জয়েন্ট, ট্রাক, লরি, অটোরিকশা, মেডিকেল বেড, ডায়নামো, এসি, ফ্রিজ, নিনিয়াম, প্যাড ড্রাম, ব্রেক সিলিন্ডার, বাম্পার ব্রাকেট, পিস্টন ও পাম্পসহ নানা সামগ্রীর খুচরা যন্ত্রপাতি।

পাশাপাশি আস্ত গাড়ি, গাড়ির ইঞ্জিন, লঞ্চের ইঞ্জিনও তৈরি হচ্ছে। এছাড়া মোটরগাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, শ্যালো পাম্পের ইঞ্জিন ব্যবহার করে টেম্পো, ট্রাক্টর, ইট ভাঙার যন্ত্রসহ পাওয়ার লুমের মেশিনও তৈরি হচ্ছে।

শুধু গাড়ির ইঞ্জিন মেরামতই নয়- জাহাজ, পাওয়ার প্ল্যান্ট, জেনারেটরসহ ইঞ্জিনচালিত সব ধরনের যন্ত্রের সমস্যার সমাধান ছাড়াও রেলের ইঞ্জিন ও বগির খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয় ধোলাইখালে। ছোট ছোট কারখানায় দক্ষ কারিগররা এগুলো তৈরি করে সারা দেশে সরবরাহের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও এগুলো সংযোজন করে দিচ্ছেন। পুরনো গাড়ি বা ইঞ্জিনকে মেরামত করে একদম নতুনের মতো করে দিতেও তাদের জুড়ি নেই।

হালকা প্রকৌশল শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বলেন, সরকার একটু সহযোগিতা করলেই আমরা উঠে দাঁড়াতে পারি। আমাদের পণ্য ব্র্যান্ড করার সুযোগ দিলে ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের দেশীয় ব্র্যান্ড তৈরি হতো। তখন ক্রেতারা ব্র্যান্ড দেখে পণ্য কিনতে পারতেন। এখন ক্রেতারা বিদেশি ব্র্যান্ড দেখে পণ্য কেনেন। দেশি ব্র্যান্ড থাকলে পণ্যের মান খারাপ হলে তা পরে বদলিয়ে নেওয়ারও সুযোগ থাকত। এ শিল্পের বড় অবদান হচ্ছে, পুরো খাতটি আমদানির বিকল্প হিসেবে কাজ করছে।