ডিজিটাল ক্লাসেও বাধা, কোন পথে হাঁটছে ইউজিসি?

বিশেষ প্রতিবেদকবিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৮:৫০ অপরাহ্ণ, ১৩/০৪/২০২০

করোনাভাইরাসের কারণে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের যেন পড়াশোনায় ক্ষতি না হয় সেজন‍্য সংসদ টেলিভিশন ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবককের এসএমএসের মাধ্যমে পড়া জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। সেখানে দেশের শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) চলছে মান্দাতার আমলের ব‍্যবস্থায়। তাঁরা অনলাইনেও ক্লাস, পরীক্ষা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলমান অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম ৬ এপ্রিল বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বন্ধের আহ্বান জানায়। এর মাত্র চারদিন পর গত ১০ এপ্রিল আবার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অনলাইনে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন বন্ধ রাখার নতুন সিদ্ধান্ত জানায় ইউজিসি। অথচ এর আগে গত ২৩ মার্চ ইউজিসি এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছিল। এভাবে একের পর এক ইউজিসির একতরফা ও স্ববিরোধী সিদ্ধান্তে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চলমান শিক্ষা কার্যক্রমে যেমন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের সেশনজটের ঝুঁকি বেড়েছে।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন— এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফলের পথে বাধা বলেও মনে করছেন।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন বলছিলেন, আমাদেরতো মন্ত্রনালয় থেকে বলা হয়েছে অনলাইনে সব শিক্ষা কার্যক্রম ঠিক রাখতে। সেজন্য আমরা আরো বেশি করে মনোযোগ দিয়েছি। শিক্ষার্থীরাও সাড়া দিয়েছে। সব কিছু স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি এই পরিস্থিতিতে। কিন্তু ইউজিসি কেন এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বোধগম্য নয়।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি  ভাইরাস সংক্রমণকালে অনলাইনই শিক্ষাক্রম চালু রাখার অন্যতম নিরাপদ উপায়। অনলাইনে শিক্ষার মান ও পরীক্ষার স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা সম্ভব বলেই হাভার্ড-অক্সফোর্ডসহ বিশ্বে সব সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ও অনলাইন নিয়মিত ব্যবহার করে এবং এখন আরও বেশি করছে।

পড়াশোনার মধ্যে থাকলে আমাদের লাভ জানিয়ে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধে ইউজিসির সিদ্ধান্তের ঘটনায় ড্যাফোডিলসহ বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের দেশ এখন অনেক ডিজিটালি এগিয়ে যাচ্ছে। আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি। এখানে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে লাভ কি? ক্ষতি আমাদেরই হবে।

Nagad

তারা আরও বলেন, আমাদের যেভাবে এই অবস্থায় সব স্বাভাবিক রাখলে কোনো সমস্যা হবে না। এদিকে অনলাইনে আমাদের যেসব কোর্স করানো হয় তার প্রায় সবক’টি ৭০ শতাংশ করা হয়ে গেছে। দুটি বিষয়ে ৬৫ শতাংশ মার্কিংও করা হয়েছে। এখন অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হলে এর সঙ্গে পরবর্তী ক্লাসগুলোর সমন্বয় করে নম্বরসহ গ্রেডিং করা সমস্যা হবে।

দীর্ঘ হলে আমাদের সেশনজটে পড়তে হবে জানিয়ে ট্রাষ্ট ইউনির্ভাসিটির আহসান হাবিব বলেন, অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে পরীক্ষা সাধারণ পরীক্ষার চেয়ে বেশি স্বচ্ছ ও বেশি কঠিন। এখানো কোনো সমস্যা হবে না। মোট কথা আমরা পড়াশোনার মধ্যে থাকলে চর্চাও থাকবে।

এদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি বলছে, করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে সরকার অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। সরকারের নিজস্ব পোর্টাল ছাড়াও ইউটিউব চ্যানেল ব্যবহার করছে। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করছে ইউজিসি।

ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষক বলেন, এই বন্ধের মধ্যে যেন শিক্ষার্থীরা কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডে না জড়ায়, তারা যেন লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এজন্য হলেও অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা প্রয়োজন। এটা কেন বন্ধ করা হয়েছে তা বোধগম্য নয়।  আমাদেরতো আগে থেকেই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ট্রাস্টি বলেন, বিশ্বের সব সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম। ইউজিসি কেবল সেই রীতির বিপরীতে নয়, ডিজিটাল বাংলাদেশেরও উল্টো পথে হাঁটছে।’

ইউজিসির সিদ্ধান্তের বিষয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা না করে ইউজিসি একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হতে পারে তাদেরটাই ঠিক বা আমাদেরটাই ঠিক। কিন্তু আমাদের তো বিষয়টি জানাতে পারতো। আমরা শিক্ষামন্ত্রী এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে এ বিষয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছি। কিন্তু ইউজিসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও আলোচনা করেনি। সচিব আমাকে বলেছেন তার সঙ্গে কথা হয়নি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, ‘এই দুর্যোগের সময় একটি সেমিস্টার বন্ধ থাকলে সমস্যা কোথায়? আগে সেশনজট থাকতো বছরের পর বছর। আমরা এখন বেঁচে থাকার চিন্তা করছি। শিক্ষার্থীদের এখন লেখাপড়া করার মতো পরিবেশ পরিস্থিতি নেই। আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির পক্ষ থেকে ইউজিসিকে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্যে ৯ এপ্রিল চিঠি দিয়ে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু কোনও আলাপ ছাড়াই ইউজিসি ছুটির দিন শুক্রবারেই একতরফা চিঠি ও প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের ৬ এপ্রিলে জারিকৃত নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে বলে জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায় যে গত ১২ এপ্রিল তারা পত্র মারফত শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অংশীজনের সঙ্গে মতালাপের ভিত্তিতে বিষয়টি সুরাহা করার অনুরোধ জানান।

সারাদিন/১৩এপ্রিল/এএইচ