টেকনাফ থেকে সাগর পথে মানবপাচার চক্র সক্রিয়!

বিশেষ প্রতিবেদকবিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৬:১৪ অপরাহ্ণ, ২৪/০২/২০২০

কক্সবাজারের টেকনাফ থানার নোয়াখালীপাড়া থেকে সাগরপথে মানব পাচারকারীরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে। সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টাকালে এক সপ্তাহে টেকনাফের বিভিন্ন স্থান থেকে নারী ও শিশুসহ ২৯ জনকে আটক করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

এর আগে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৩৮ জন যাত্রী নিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে সেন্টমার্টিনের কাছে একটি ট্রলার ডুবে যায়। এ ঘটনায় ২১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মারা যান অনেক বাংলাদেশি।

সে সময় টেকনাফ উপকূলের নোয়াখালীপাড়ার কাটাবনিয়া-কচুবনিয়া ঘাট ‘মালয়েশিয়া এয়ারপোর্ট’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়। সম্প্রতি আবারও এ পথে মানবপাচার বেড়ে গেছে।

জানা গেছে, ১১ ফেব্রুয়ারি সেন্টমার্টিনের কাছে ডুবে যাওয়া ওই ট্রলারের ১৩৮ জন যাত্রীর মধ্যে ৭৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ৪৪ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। ওই ঘটনায় ১৯ জনকে অভিযুক্ত করে কোস্টগার্ডের দায়ের করা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ লিয়াকত আলী বলেন, গত কয়েক দিনে আটকের সংখ্যাই বলে দিচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাচারকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ক্যাম্পগুলোতে টহলও বাড়ানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাত গভীর হলেই টেকনাফ-উখিয়া সড়কে সন্দেহজনক গাড়ির আনাগোনা বেড়ে যায়। সন্ধ্যার পরপরই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিও এবং প্রশাসনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে তখন সক্রিয় হয়ে ওঠে অপরাধী চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে এসব গাড়িতে চলে মানবপাচার। নারী ও শিশুরাই প্রধান টার্গেট। নীরবে পাচারকারীরা সাগরপথে মানবপাচার চালিয়ে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা শিবির থেকে পাচার হওয়া মেয়েদের অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় যৌনকর্মীতে। ছেলেশিশুদের বাধ্য করা হয় বিভিন্ন শ্রমে। মালয়েশিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং ভারত ও নেপালেও তাদের পাচার করা হয়।

টেকনাফের সাগর তীরবর্তী কয়েকটি এলাকার পাশাপাশি কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বেশে কিছু পয়েন্ট দিয়ে মানবপাচারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাচারকারীরা। এরমধ্যে কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছটা, ফিশারিঘাট, নাজিরাটেক, সমিতিপাড়া; মহেশখালীর সোনাদিয়া, গোরকঘাটা, কুতুবজোম, ধলঘাটা; উখিয়ার সোনারপাড়া, রেজুরখাল, ইনানী, ছেপটখালী, মনখালী; টেকনাফের বাহারছড়া, নোয়াখালী, শাহপরীরদ্বীপ, কাটাবনিয়া, খুরেরমুখ, হাদুরছড়া, জাহাজপুরা, কচ্ছপিয়া, শামলাপুর সদরের ঈদগাঁও, খুরুশকুল, চৌফলণ্ডী, পিএমখালী, চকরিয়া, পেকুয়া; চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা ও পটিয়া উল্লেখযোগ্য।

জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে দেড় হাজারের বেশি আশ্রয়প্রার্থী বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়েছে; যা ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে সাগর পাড়ি দেওয়া মানুষের তুলনায় প্রায় ৫০ গুণ বেশি। ২০১৫ সালের সাগরযাত্রীদের বেশিরভাগই ছিল পুরুষ, কিন্তু ২০১৮ সালের যাত্রীদের শতকরা ৫৯ ভাগই নারী ও শিশু।

র‌্যাব-১৫, সিপিসি-১ টেকনাফ ক্যাম্পের কোম্পনি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মির্জা শাহেদ মাহতাব বলেন, ‘সাগরপথে মানবপাচারে জড়িতদের ধরতে র‌্যাবের একটি টিম কাজ করছে। পাশাপাশি ক্যাম্পে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

সারাদিন/৪২ফেব্রুয়ারি/টিআর