মাতৃভাষা বনাম বিশ্বায়নের ভাষা

গাজী তানজিয়াগাজী তানজিয়া
প্রকাশিত: ৮:০৮ অপরাহ্ণ, ২০/০২/২০২০

ত্রিশের দশকে আসাম ব্যবস্থাপক সভায় মওলানা ভাসানী বাংলায় বক্তৃতা করতেন। বাঙালি এবং অসমিয়া হওয়া সত্ত্বেও সব সদস্য তাদের বিদ্যাবুদ্ধি প্রমাণের জন্য ইংরেজিতে ভাষণ দিতে অভ্যস্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের আসাম বিধান সভায় বাংলা ভাষা স্বীকৃতি পায়। এই স্বীকৃতি প্রাপ্তির পথ তৈরি করেন মওলানা ভাসানী। এ ব্যাপারে আসামের বাংলা ভাষাভাষীরা আজও তাকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।

একটা বৃহৎ রাষ্ট্রে যখন বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের বাস থাকে তখন ভাষা নিয়ে তাদের আবেগের, লড়াইয়ের বা সংগ্রামের জায়গাটা ঠিক কোন পর্যায়ে থাকে এটা বাংলার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস না পড়লে বোঝা যাবে না। বাংলা ভাষা নিয়ে বাঙালির লড়াই ছিল এক দশক বা তারও বেশি সময়কাল জুড়ে। কোনো একটা ভাষাগোষ্ঠীর মানুষকে শাসনে-শোষণে ও বশে রাখতে হলে প্রথমেই হরণ করতে হয় তার ভাষা-সংস্কৃতির স্বাধীনতা, আর চাপিয়ে দিতে হয় শাসক গোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতি। বাংলা ভাষার ওপর এই আধিপত্যবাদ এসেছে বারবার।

১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন’-এর উদ্বোধনী ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা।’ অথচ সেই অনস্বীকার্য বাস্তবতাকে অস্বীকার করে ইতিপূর্বেই অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের নামে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষকে দ্বিখন্ডিত করেছিল। ফলে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তানের। পূর্ববাংলার জনগণ ‘পাকিস্তান’ নামের নতুন রাষ্ট্র লাভের মধ্য দিয়ে তাদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু একদিকে শ্রেণিবৈষম্যের তীব্রতা, অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর দ্বারা জাতিগত শোষণ ও ভাষাগত নিপীড়নের ফলে অচিরেই সে স্বপ্ন ভেঙে যায়। সেই স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণাই প্রতিফলিত হতে থকে পরবর্তীকালের বিভিন্ন বিক্ষোভ ও গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এরই তীব্রতম প্রকাশ ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন। রাজনৈতিক তাৎপর্য ছাড়াও বাঙালি মুসলমানদের আত্মপরিচয়কে ঘিরে যে অস্পষ্টতা ও অস্বচ্ছতার কুয়াশা তাদের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, এই আন্দোলনই প্রকৃতপক্ষে সেই কুয়াশাকে দুহাতে সরিয়ে বাঙালি সত্তার উন্মেষ ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে বাংলাদেশের সংগ্রামী মানুষের সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও বাঙালি জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার বহু রক্তাক্ত স্মৃতি জড়িয়ে থাকলেও এ-কথা আজ সর্বজনবিদিত যে, এই নিরন্তর আন্দোলনের পরিণতিতেই ‘বাংলাদেশ’ নাম-পরিচয়ে মাতৃভাষাভিত্তিক একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম সম্ভব হয়েছে।

ভাষা শুধু মনের ভাব প্রকাশের বা নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময়ের মাধ্যম বা প্রশাসন পরিচালনার অন্যতম হাতিয়ার নয়। ভাষা একটা সত্তার প্রতীক। একটা নির্দিষ্ট ভাষাকে অবলম্বন করে একটা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বিশ্বের কাছে তাদের জাতীয় অস্তিত্ব তুলে ধরে। তবে এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে যে ভাষা ব্যবহার করা হয় সেটা আসলে একটা বড় ভূখন্ডের মানুষ ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগতভাবে ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। বিশ্বের কোথাও লিখিত ভাষা আর মুখের ভাষা এক নয়। সম্প্রতি শিশুদের জন্য বিশেষায়িত একটা টিভি চ্যানেলের এক অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, তারা ঘোষণা করছেন ‘যাদের প্রমিত বাংলায় কথা বলতে অসুবিধা হয় না, তারা এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারবেন’। অর্থাৎ এদেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীরও বেশিরভাগ মানুষ সম্ভবত প্রমিত বাংলায় কথা বলতে পারেন না। এক্ষেত্রে বোঝা যাচ্ছে ভাষাজ্ঞান আর সাক্ষরতাজ্ঞান সব সময় এক সঙ্গে থাকে না।

এখন বাঙালির এক বিরাট সংকট মূলত ভাষার আগ্রাসন নিয়ে। বিশ্বায়নের যুগে কর্মক্ষেত্রে ভিন্ন ভাষার প্রায়োগিক প্রয়োজনীয়তা মুখ্য হয়ে উঠেছে। আমরা যেখানে উচ্চশিক্ষা এবং আদালতের ভাষা হিসেবেও এখন পর্যন্ত বাংলা চালু করতে পারিনি, সেখানে বিশ্বায়নের কারণে আরও একটা ভাষা শেখা প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছে। বিশ্বায়ন মানে যেখানে রাষ্ট্রগুলোর সীমারেখা আর খুব বড় কথা নয়। বৈশ্বিক অর্থনীতি অর্থনৈতিক উদারীকরণের নামে এবং এর সঙ্গে সঙ্গে বহুজাতিক সংস্থাগুলোর আগ্রাসন মিলে এই ‘বিশ্বায়ন’ এখন রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে তছনছ করে দিচ্ছে। ফলে প্রাথমিক থেকে সর্বস্তরের শিক্ষায় একটি ‘বিশ্বভাষা’ হিসেবে ইংরেজি ভাষার ভূমিকা ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। যার ফলে অনেকের ভেতরে এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হচ্ছে যে ভাষাটা বেশি শক্তিশালী সেটাকে আমরা বেশি প্রাধান্য দেব। নিজের ভাষাটা কম শক্তিশালী তাই একে ততটা গুরুত্ব না দিলেও চলবে। বিশ্বায়ন এসে এই ব্যবস্থাকে আরও পাকাপোক্ত করে যাচ্ছে।

এক্ষেত্রে আমাদের উদ্বেগের কারণ এখানে যে, আমাদের ভাষাটা তাহলে বিপন্ন হয়ে উঠছে না তো! আমার ভাষায় অসাধারণ সাহিত্য আছে, গান আছে, চলচ্চিত্র আছে, আছে নাটক। এখন অন্য একটা ভাষার আগ্রাসন আমার ভাষাটাকে গৌণ করে দেবে না তো? এ বিষয়ে ‘ল্যাঙ্গুয়েজ ডেথ’ নামে একটা বই লিখেছেন ডেভিড ক্রিস্ট্যাল। তিনি এই প্রশ্নটা সেখানে তুলেছেন। আবার তিনি ‘দ্য গ্লোবালাইজেশন অব ইংলিশ’ বলে একটা বইও লিখেছেন। কিন্তু তার মতে, তিনি একটা মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে বলেন যে, নিজের ভাষাটাকে আমার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার জন্য আমি আরও শক্তিশালী করব। আবার একটা বৃহৎ যোগাযোগের ভাষাকেও আমি গ্রহণ করব। তবে সে ক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন থেকে যায় যে, ভাষার যে শক্তির সিঁড়ি সেই সিঁড়ির কোন ধাপে আমার ভাষার জায়গা হবে? কতটা তাকে ঠেলে শক্ত ধাপের ওপর তুলতে পারব, সে দায়িত্ব আমাদেরই। বিশ্বায়নের যুগে আমাদের ভাষাকে একটা শক্ত অবস্থানে ধরে রাখার জন্য বিদ্বৎসমাজের চ্যালেঞ্জ যেন আরও এক ধাপ বেড়ে গেল। রক্তে অর্জিত ভাষাকে সিঁড়ির উঁচু ধাপে রাখা আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হয়ে উঠেছে। তাই বলা যায়, বাঙালিকে নিজেদের ভাষা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের নতুন পর্ব শুরু করতে হবে এখন।

লেখক : কথাসাহিত্যিক