ভালোবাসার দিনে পুষ্প বিক্রেতাদের রাঙ্গানো জীবন

গোলাপ ছাড়া কি প্রেমদিবস মানায়! আর এর মধ্যে এসেছে বসন্তের প্রথম প্রহর। এর মধ্যেই দুই দিবস একদিনে হওয়ায় গোলাপের দাম তুঙ্গে। তবুও যেন প্রেম দিবস ও পহেলা ফাল্গুনে কাছের মানুষটির হাতে একটা লাল গোলাপ তুলে না দিলে যেন এই বিশেষ দিনটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

সত্যি প্রেমের কী মহিমা! বুধবার (১২ ফেব্রুয়ারি) থেকেই শহরের বিভিন্ন প্রান্তে এক-একটি গোলাপ বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়! শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) তা সবাই কিনছে। উদ্যোম আর প্রেমের কাছে টাকা যে নগণ্য তার প্রমাণ মিলেছে এদিনে। পছন্দের সঙ্গী-সঙ্গিনীকে ভালবাসার প্রতীক (লাল গোলাপ) উপহার দেওয়ার জন্য সকাল থেকেই ফুলের দোকানে ভিড় জমিয়েছেন প্রেমিক-প্রেমিকারা।

ফুলচাষি ও ফুল ব্যবসায়ী সমিতির নেতা নারায়ণ নায়েক সারাদিন ডট নিউজকে জানান, দিন কয়েক আগেও যে গোলাপ এক টাকায় বিকোতো, রাতারাতি তার দাম হয়ে গিয়েছে ১০ টাকা! পাইকারি বাজারে এমনি সময় ১০০টি গোলাপের দাম থাকে ১০০ টাকা।

প্রায় ১৫/১৬ বছর আগে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিবনাথপুর গ্রামের শাহ আলী এক টুকরো জমি বন্ধকী লিজ নিয়ে তিনি ফুল চাষ শুরু করেন। ফুলের মৌসুম শেষ হলে বিভিন্ন ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা উৎপাদন করেন তিনি। আর এভাবেই তিনি ফিরে পান নতুন দিন। পাল্টে যায় শাহ আলীর জীবন।

ফুল চাষের জন্য এখন নিজেই জমি কিনেছেন। এছাড়াও বন্ধকী নেওয়া জমির পরিমাণও বেড়েছে। এসব জমিতে নানা রঙ-বেরঙের ফুল ও ফুলের চারা চাষ করেন তিনি। এখন ভালবাসা দিবস বা বসন্ত উৎসব থেকে শুরু করে মাতৃভাষা দিবসসহ সব দিবসই তার মুখস্ত থাকে। কারণ এসব দিবসে তার ফুলের চাহিদা বেড়ে যায়।

শাহ আলী বলেন, মোট ৫০ শতক জমিতে ফুলের চাষ করেছি। এর মধ্যে ৩০ শতক নিজের এবং বাকি ২০ শতক লিজ নেওয়া। ডিসেম্বর মাস থেকে শুরু করি ফুলচাষ। এরই মধ্যে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে প্রায় দেড় লাখ টাকার ফুলগাছ উৎপাদন করেছি।

শুধু শাহ আলী নয়। শিবনাথপুর গ্রামের আলোয়া বেগম, আব্দুল হালিম, নাসির উদ্দিন, আব্দুল মান্নান, রফিকুল ইসলামসহ অনেককেই নতুন জীবন দিয়েছে রঙিন ফুল।

আব্দুল হালিম বলেন, এক সময় হাটে হাটে সবজি কেনা-বেচা করে সংসার চালাতাম। প্রায় ২০ বছর আগে নিজের প্রায় ৪০ শতক জমিতে ফুলের চাষ শুরু করি। পাশাপাশি অন্য ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারাও উৎপাদন শুরু করি এতটুকো জমিতেই। আর তাতেই পাল্টাতে থাকে ভাগ্যের চাকা। ফুলচাষ করে ৪০ শতক জমিতে ৪/৫ মাসেই আয় করেছি ২ লাখ টাকা। আর বাকি সময়ে অন্য চারা উৎপাদন করেও আয় হয় লাখ লাখ টাকা।

গ্রাম শুধু নয়, আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের অন্তত অর্ধশতাধিক কৃষক ফুল ও গাছের চারা উৎপাদন করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। অক্টোবর মাসের প্রথমদিকে চাষিরা দেশি-বিদেশি গোলাপ, চাইনিজ গাঁদা, হাইব্রিড গাঁদা, দেশি গাঁদা, বর্ষালী গাঁদা, ডালিয়া, সূর্যমুখী, হাসনাহেনা, গন্ধরাজ, জবা, গেটফুল, চন্দ্রমল্লিকাসহ নানা জাতের ফুল গাছের চাষ শুরু করেন।

ডিসেম্বর মাসের প্রথম থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এসব ফুলগাছ বিক্রি হয়। এ গ্রামের ফুলগাছ চাষিদের দেখে সারটিয়া, হামকুড়িয়া, শিয়ালকোলসহ আশপাশের গ্রামগুলোর কৃষকরাও ফুল চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন বলেও জানান তারা।

শিয়ালকোল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান শেখ বলেন, শিবনাথপুর গ্রামটি ফুল চাষের জন্য খ্যাতি পেয়েছে। ওই গ্রামে চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী মানুষের সংখ্যা খুবই কম। বেশির ভাগ মানুষই হতদরিদ্র। বেশ কয়েকবছর ধরে গ্রামের কিছু লোক ফুলগাছ ও অন্য ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা উৎপাদন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুল হক বলেন, আমরা ফুল ও ফলগাছ চাষিদের রেজিস্ট্রেশন করাচ্ছি। ইতিমধ্যে জেলায় ৬৫ জন চাষি নিবন্ধিত হয়েছেন। অন্যদেরও পর্যায়ক্রমে নিবন্ধিত করা হবে। এসব চাষিরা বছরের ৪/৫ মাস ফুলের চাষ ও চারা উৎপাদন করে থাকেন। পরবর্তীতে হর্টিকালচার সেন্টারের প্রশিক্ষণেও তাদের তালিকা করা হচ্ছে। এদের প্রশিক্ষিত করতে পারলে আরও বেশি বেশি ফুলের উৎপাদন বাড়বে।

সারাদিন/১৪ফেব্রুয়ারি/টিআর