ধর্ষণের মনোজগৎ ও আমাদের প্রেক্ষাপট

কবীর চৌধুরী তন্ময়কবীর চৌধুরী তন্ময়
প্রকাশিত: ১:১৫ অপরাহ্ণ, ১০/০২/২০২০

বন্যতা থেকে বর্বরতা আর বর্বরতা থেকে মানুষ ধীরে ধীরে সুশৃংঙ্খল জীবন-যাপনে এগিয়ে আজকের এই দিনে এসে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দ্বারা তাদের জীবন প্রবাহের মান উন্নয়ন করেছে। আর এই বর্বরতা থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স তথা জ্ঞানী মানুষের আবির্ভাব দুই লক্ষ বছর আগে হলেও মানব সভ্যতার গোড়া পত্তন হয়েছেন আজ থেকে মাত্র পাঁচ হাজার বছর আগে। অভিধানের ভাষায়, সভ্য জাতির জীবনযাত্রা নির্বাহের পদ্ধতি, সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম ও বিদ্যার অনুশীলনহেতু মন মগজের উৎকর্ষ সাধণ করাই হচ্ছে সভ্যতা। আর মানুষের মন মগজে কী হচ্ছে- এটি দৃশ্যমান নয়, তবে গবেষণার বিষয়। এই মানুষ তার সকল কাজ সম্পাদন করে থাকে মন-মগজের নির্দেশনা থেকেই।

ধর্ষণও মন-মগজের বহিঃপ্রকাশ। আর মানব সভ্যতার আদিকাল থেকেই এই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে আসছে। তখনকার সময়ে ধর্ষণকেও ধর্ষণ বলে মনে করতো না। অনেকের মতে, মানব সভ্যতার শুরুটা ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে এটি পুরুষতান্ত্রিক হয়ে উঠে। আর তখন থেকেই একশ্রেণির পুরুষ মনে করে, মেয়ে মানুষ হচ্ছে তাদের অন্য আর দশটা সম্পত্তির মতোই ভোগ্যপণ্য সম্পত্তির একটি! তাই নারীকে যেমন ইচ্ছে তেমন ভাবে ভোগ-বিলাস করার প্রবণতা সৃষ্টি হয় কতিপয় পুরুষের মন-মগজে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-সভ্যতার দৃষ্টিকোণে ধীরে ধীরে এটি স্বাভাবিক হয়ে উঠে। তখন নারীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। যেমন, শত্রুকে চূড়ান্তভাবে অপমান-অপদস্ত করার একটি অনুষঙ্গ হলো প্রতিপক্ষের মা-বোনদের ধর্ষণ করা। আর এই ধর্ষণ-হত্যার মধ্যেই শত্রুপক্ষের পরাজয় বিবেচনা করা হতো যা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে দুই লাখেরও বেশি নারীর সম্ভ্রম বিনাশ করার মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকার বাহিনী- এই চেষ্টাই করেছিল।

মানুষের মন-মগজে এই ধর্ষণের উপস্থিতি কেন বা কী কারণে হয়ে থাকে এটি খুঁজতে গিয়ে দেখি, ধর্ষণ করার প্রবণতায় ‘শিশু’ কিংবা ‘শত বছরের বৃদ্ধা নারী’কেও উপেক্ষা করছে না ‘ধর্ষক’। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার শত বর্ষের অন্ধ বৃদ্ধাকে ধর্ষণ করেছে ১৪ বছরের কিশোর! অন্যদিকে কয়েক মাসের কণ্যা সন্তানও ধর্ষকের নোংরা থাবা থেকে রেহাই পায়নি, পাচ্ছে না। আবার এই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ছেলে শিশু পর্যন্ত! মূলত, মন-মগজ দ্বারা পরিচালিত ধর্ষণ প্রবণতা ব্যক্তিবিশেষের উপর নির্ভর করে ধর্ষণের প্রকারভেদ। কখনো কখনো প্রতিশোধ পরায়ণ, কখনো সুযোগ পেয়ে আবার কখনো নিজেই কৌশল নির্ণয় করে ধর্ষণের মত বর্বরতা করে থাকে।

বিখ্যাত নিউরোলোজিস্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ফ্রয়েডের মতে, মানুষ মূলত তিনটি সত্ত্বার সমন্বয়ে গঠিত। ইড, ইগো এবং সুপার ইগো। ‘ইড’ মানুষকে জৈবিক সত্ত্বার দিকে নিয়ে যায়। মানব মনের স্বভাবজাত চাহিদা পুরণে ‘ইড’ বার বার উৎসাহিত করে তোলে। সহজ করে বললে, মানুষের মন যা চায় তাই পূরণে এই ‘ইড’ কাজ করে। আর ‘ইড’ মানুষ এবং পশুর মাঝে সমানভাবে বিরাজমান। ইড-এর কোনও মানবিক দিক বা বিকাশ নেই। এর পুরোটায় মানুষ কিংবা পশুর লোভ-লালসা আর কাম চিন্তায় ভরপুর। ‘ইড’ মানুষের ভিতরের এক প্রকার সুপ্ত পশু যার প্ররোচনায় মানুষ যেকোনো অসামাজিক, অনৈতিক, অপরাধ থেকে শুরু করে খুন-ধর্ষণের মতন বর্বর কর্মকাণ্ড করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

‘ইড’ আর ‘সুপার ইগো’র মাঝখানে বসবাস ‘ইগো’। ‘ইগো’র কাজ হচ্ছে ‘ইড’ এর কাজগুলোকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বাস্তবায়ন করা, সে দিকে মানুষকে প্ররোচিত করা।

আর ‘সুপার ইগো’ হচ্ছে মানুষের বিবেক। ‘ইড’ যখন জৈবিক কামনা বাসনা পুরণ করতে উদ্দীপ্ত করে তোলে, তখন ‘সুপার ইগো’ একে বাধা দেয়। ‘সুপার ইগো’ মানুষকে সব সময় মানবিক হতে সহায়তা করে, ভাল কাজ করতে উদ্দীপ্ত করে। যদিও সুপার ইগোর প্রতি অবিচল থাকা নির্ভর করে ব্যক্তির নৈতিক, পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধের উপর।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, পরিবার থেকে আমরা কী শিখে এসেছি বা শিখছি! প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কাঠামো আমাদের কী ধরনের মুল্যবোধ শিখিয়েছে বা শেখাচ্ছে?

আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-সংসারে সন্তানের সামনেই বাবা মাকে প্রহার করছে। অশ্লীল ভাষায় গালাগালিসহ শারীরিক নির্যাতনও প্রায় রুটিন কাজ। পান থেকে চুন খসলেই নারীর ওপর পুরুষের নির্যাতন- এই শিক্ষাটা পরিবার থেকেই প্রথমে পেয়ে আসছে। অন্যদিকে নারীকে কন্ট্রোলে রাখতে হবে, তাদের বুদ্ধি-সুদ্ধি কম, নারী পুরুষের সেবাদাসী, স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর বেহেস্ত, স্ত্রী থাকার পরেও অন্য নারীর সাথে মেলামেশা, আকার-ইঙ্গিত প্রদর্শন করে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য কথা বলাবলি, একটা নারী গেলে দশটা আসবে, পুরুষের জন্যেই নারী, পুরুষ ইচ্ছে করলেই দশটা বিয়ে করতে পারে-এই ধরনের পারিবারিক কথোপকথন বা কলহের মাঝেই ধীরে ধীরে যে ছেলেটি শিশু-কিশোরের বয়স পেরিয়ে যুবক হয়, তখন তার মাঝে নারীর প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধাবোধ ঠিক তেমনটা প্রতিফলন দেখা যায় না।

অনুরুপ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও। অষ্টম শ্রেণিতে ‘নিজেকে জানো’ বইতে আর নবম শ্রেণিতে ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে শিক্ষার্থীদের কী শিখিয়েছেন, শিখাচ্ছেন? অষ্টম শ্রেণিতে ‘পরস্পরের সম্মতিতে যৌন অনুভূতি প্রকাশ দোষণীয় নয়’ আর নিজ স্ত্রীকে ফাঁকি দিয়ে শালীর সঙ্গে সহীহ পরকীয়ার কলাকৌশল নবম শ্রেণিতেই শিক্ষা দিয়েছেন, দিচ্ছেন!

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এই ধরনের শিক্ষা আমাদের নৈতিক বিকাশ ঘটাতে কতটুকু সক্ষম হয়েছে বা হবে! আবার বাংলা সাহিত্যের গল্প, নাটক, উপন্যাস, কবিতায় নারীকে কী হিসেবে চিত্রিত করেছেন কবি সাহিত্যিকরা? এই গল্প/সাহিত্য পড়ে আপনার/আমার মস্তিষ্কে কী ধরনের চিত্র-কল্পনা তৈরি হয়- এটি একবারও কি কেউ ভেবে দেখেছেন?

আমাদের বিজ্ঞাপনে, নাটক, টেলিফিল্ম, ছায়াছবি, শিল্পকলা একাডেমি, চারুকলা, ললিতকলা, মিডিয়ায় নারীকে ভোগ-বিলাসের সামগ্রী অথবা ভোগ্যপণ্য, কামনার প্রতিমা রূপে উপস্থাপন করে-এখানে ভাল কিছু আশা করা কঠিন।

এই জায়গায় গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

পাঠক স্মরণার্থে, ইউটিউব জুড়ে হিরো আলম’রা কী ধরনের ভিডিও ভাইরাল করেছে, করছে? এখন সস্তা জনপ্রিয়তার উদ্দেশ্যে কী ধরনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, হচ্ছে? আর ওইসব ভিডিও আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থী ও এক শ্রেণির কিশোর-যুবকদের কী শিক্ষা দিচ্ছে-এগুলো কি রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ববান ব্যক্তিবর্গ কখনো ভেবে দেখেছে কিংবা খতিয়ে দেখে গবেষণাধর্মী কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে? অন্যদিকে পর্নসাইট বন্ধ করেছে বলে সরকার যতই বলুক, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ভিপিএন দিয়ে যে কেউ ওইসব সাইটগুলোতে অনায়াসে প্রবেশ করতে পারছে।

তাহলে আধুনিক এ সভ্যতা থেকে ধর্ষণের মত বর্বরতা কীভাবে রোধ করবেন?

আমি মনেকরি, ধর্ষণ নিয়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন আছে। এটি একক কোনো ‘বিন্দু’র উপর নির্ভরশীল নয়। আবার কোনও একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শ্রেণির মধ্যেই ধর্ষণ মনোভাব সীমাবদ্ধ নয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাদ্রাসার কতিপয় শিক্ষকও আজ ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত। আবার মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত বা ধর্মগুরুরাও এই ধর্ষণ কাজের অপরাধ থেকে নিজেদের আজও মুক্ত রাখতে পারেনি। করপোরেট হাউজ থেকে মিডিয়া হাউজগুলোও একই অভিযোগে অভিযুক্ত। সাম্প্রতিক ‘মি টু’ আন্দোলন অনেক মিডিয়া ব্যক্তিত্বের মুখোশ খুলে দিয়েছে।

ধর্ষণের পেছনে মুলত কিছু মিলন-কৌশল থাকে, স্থান-কাল থাকে যা প্রায় পুরুষের মনেই একান্তভাবে গাঁথা। এই কৌশল তৈরি হয় আবার গুণগতভাবে পূর্বপুরুষ থেকে প্রাপ্ত অনুষঙ্গ এবং ব্যক্তিগত বিভিন্ন ব্যাপার কিংবা পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে।

ধর্ষকদের ক্ষেত্রে ধর্ষণ করার পেছনে যে মানসিকতা তার উপর ভিত্তি করে এই কৌশল নির্ণয় হয়ে থাকে যেমন, সুবিধাবঞ্চিত পুরুষ-যার কাছে ধর্ষণ একটা অবলম্বন, বিশেষায়িত ধর্ষক-যারা শুধমুাত্র আগ্রাসী যৌনকর্মের মাধ্যমেই যৌন উত্তেজনা পায়, সুযোগসন্ধানী ধর্ষক-যারা সবদিক বিবেচনা করে যদি দেখে ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই তখনই ধর্ষণ করে, মিলনের তীব্র চাহিদা সম্পন্ন পুরুষ-যারা কর্তৃত্বপরায়ণ এবং মনোবিকারগ্রস্ত যেমন, রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা! ফুটপাত ধরে হাঁটা শিক্ষার্থী কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে টেনে হিঁচড়ে ঝোপের আড়ালে নিয়ে যায় ধর্ষক মজনু। চিৎকার চেঁচামেচি এবং ধস্তাধস্তি করেও ওই শিক্ষার্থী নিজেকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেনি।

অন্যদিকে ২০১৭ সালের ২৩ জুন বিকাল ৩টার দিকে বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাট উপজেলার বড় গাওলা গ্রামের পনের বছরের এক কিশোরীকে ঘরে ঢুকে একই এলাকার দুই যুবক ধর্ষণ করে এবং তা মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে পরে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয় (ওই দুই ধর্ষককে ২০১৯ সালের ৭ জুলাই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে বাগেরহাটের একটি আদালত)। আর সাম্প্রতিক গাজীপুরে চারজন কিশোর মিলে ধর্ষণ করেছে তাদের সহপাঠী এক কিশোরীকে। সেই ধর্ষণকে, ধর্ষণকর্মকাণ্ডকে তারা বীরত্বপূর্ণ মনে করে তাদের ফেইসবুক লাইভে এসে রীতিমত উল্লাস করেছে!

এখানে একটু চিন্তা করে দেখুন, ইউটিউবে এই ধরনের ধর্ষণকাজ বা ধর্ষণচেষ্টার দৃশ্যগুলো মূলত ধর্ষকের মনে বীরত্বভাবের জন্ম দিয়েছে। ইউটিউব পর্দার দৃশ্যায়ন বা রঙিন কৌশলগুলো বাস্তবায়ন করতেই তারা এই ধরণের অপরাধ করেও তাদের ভেতর অনুশোচনা নেই, নেই অপরাধবোধ! ‘বন্ধুরা, কাল জেলে (কারাগার) যেতে হবে’ বলেও ফেসবুকে তারা তাদের উল্লাস দেখিয়েছে!

সমাজ-রাষ্ট্রের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে কতোটা অবক্ষয় সৃষ্টি হলে, মন-মগজটা কতোটা অন্ধকারে নিমজ্জিত হলে এই কিশোর বয়সেই ধর্ষক হয়ে উঠে (?)- এটি আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। প্রতিটি পরিবারের কর্তাবক্তিসহ সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে ধর্ষণরোধ করতে এগিয়ে আসতে হবে।

অপরাধবিজ্ঞানের একাডেমিক আলোচনায় ট্রাভিস হারসি স্যোসাল বন্ডিং তত্ত্বে উল্লেখ করেছেন; পরিবারে বাবা মায়ের সাথে নিবিড় সম্পর্ক, বাবা-মায়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়া, সমাজ, রাষ্ট্র এবং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা, পড়াশোনার প্রতি ঝোঁক, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটানো, পড়াশোনার পাশপাশি সহ শিক্ষা পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সমাজ এবং রাষ্ট্রের রীতি নীতি এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের যে কোন ধরনের প্রথা ও নীতি বিরুদ্ধ কাজকর্ম থেকে বিরত রাখতে সহায়তা করে থাকে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে গেছে বলে অনেকে মিডিয়া ও স্যোশাল মিডিয়ায় তার তীব্র প্রতিবাদসহ বিচারহীনতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে না পারার ব্যর্থতাকে অনেকে দায়ী করেছে, করছেন। এটিকে একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার যেমন সুযোগ নেই তেমনিভাবে (ভীত) তথ্য-উপাত্তকে উপেক্ষা করাও উচিত নয়। জাতিসংঘ কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্ব ক্রাইম ট্রেন্ড রিপোর্টের ২০১৫ সালের ভার্সন থেকে জানা যায়, প্রতিবছর সবচেয়ে বেশী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ১০টি দেশের তালিকায় এক নম্বর অবস্থানে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাউথ আফ্রিকা, সুইডেন, ভারত, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইউরোপের ফ্রান্স, উন্নত রাষ্ট্র কানাডা, শতভাগ শিক্ষার দেশ শ্রীলঙ্কা এবং দ’শে ইথিওপিয়া থাকলেও ধর্ষণ অপরাধে বিশ্বের অন্যতম বিপদজনক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নাম নেই।

অন্যদিকে, ধর্ষণের অপরাধে প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদ, গুলি করে হত্যা, ঢিল মেরে মেরে হত্যা, ফাঁসি দিয়ে হত্যার দণ্ড নিশ্চিত করা দেশগুলোতে আজও ধর্ষণ বন্ধ করা যায়নি বা কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জন সম্ভব হয়নি। তাই বলে বিচারের নামে দীর্ঘ সময় পার করা, রাজনৈতিক নোংরা হস্তক্ষেপ, বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য নয়। সময়ের প্রয়োজনে আইনের ধারাও পরিবর্তন, পরিবর্ধন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আর চলমান আইনের ১৮০ কার্যদিনের মধ্যে বিচার কাজ সম্পন্ন ও দৃষ্টান্ত শাস্তি নিশ্চিত করার বার্তা মিডিয়ার মাধ্যমে, আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্ষণ, হত্যাসহ সামাজিক অবক্ষয় নিয়ন্ত্রণ-রোধ করতে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রযন্ত্র ও মিডিয়ার সমন্বয়ে জনসচেতনা মুলক কর্মকাণ্ডের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে স্থানীয় সরকারকে কাজে লাগিয়ে পাড়ায়, মহল্লায় যৌন নিপীড়ন ‘সেল’ বা ‘কমিটি’ গঠন করা উচিত। মসজিদগুলোতে প্রতি শুক্রবার খুদবার আগে শিশু-নারী নির্যাতন, ধর্ষণ-হত্যা নিয়ে ইমাম কর্তৃক আলোচনা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মপণ্ডিত দ্বারা উঠান বৈঠকের আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন’ নিয়ে আলোচনা এবং তার বিপরীতে প্রচলিত আইনে কী শাস্তির বিধান আছে-এইসব বিষয়ে স্থানীয়ভাবে সচেতন-সাবধান করতে হবে।

সরকারি, বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ণবিরোধী সেল গঠন করতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছেন সেই ২০০৯ সালে। নতুন করে (১০ জুলাই, ২০১৯) শিশু নির্যাতন রোধে দেশের প্রতিটি স্কুলে অভিযোগ বক্স রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আমি মনেকরি, ধর্ষণ অপরাধে বিশ্বের অন্যতম বিপদজনক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নাম তালিকাভুক্ত হওয়ার আগেই আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দায়িত্ব হয়ে পড়েছে।

ধর্ষণের মত বর্বরতার হাত থেকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে হলে সর্বপ্রথম আমাদের পুরুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের আরও সচেতন, প্রতিবাদমুখর হওয়া উচিত। সেই সাথে আমাদের ‘সুপার ইগো’ বা ‘মানুষের বিবেক’ জাগ্রত করার মাধ্যমে মানবিক মুল্যবোধ নিশ্চিত করতে পরিবার থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিকে গবেষণা করে সিন্ধান্ত নিতে হবে। শিশু-কিশোর থেকেই নৈতিকতা বা বিবেকবোধ সুস্থ করে গড়ে তুলতে হলে পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক শিক্ষা এবং মূল্যবোধের উপর আমাদের জোর দিতে হবে, যেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
-সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিষ্ট ফোরাম (বোয়াফ)

সারাদিন/১০ফেব্রুয়ারি/টিআর