বোরো আবাদে অনাগ্রহের কারণ ধানের মূল্য না পাওয়া!

হবিগঞ্জের চাষীদের ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কয়েক বছর ধরে বোরো ধান চাষ করে লোকসান হচ্ছে। এই লোকসানের কারণে বোরো আবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন এই অঞ্চলের কৃষকরা। ফলে চলতি বোরো মৌসুমে অনেক জমি অনাবাদি রাখছেন কৃষকরা।

বোরো আবাদের মৌসুম শেষের দিকে আসলেও জেলায় এখনও প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদ পড়ে রয়েছে। তবে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বলছে, তাদের এ অভিমান অস্থায়ী। অনাবাদ কমাতে বিকল্প শষ্য চাষে আগ্রহী করা হচ্ছে তাদের। জানা যায়,কয়েক বছর ধরে হবিগঞ্জে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। বন্যার কারণে মাথায় হাত পড়ে কৃষকদের।

সেই সাথে ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন কৃষকরা। অব্যাহত লোকসানের কারণে বোরো চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না তারা। বিকল্প পেশা নিয়ে অনেকে আবার এলাকা ছেড়ে পারি জমাচ্ছেন শহরে। ফলে দেখা দিচ্ছে শ্রমিক সংকটও। সব মিলিয়ে হতাশাগ্রস্থ কৃষক পতিত রেখে দিচ্ছেন অনেক জমি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বোরো আবাদের মৌসুম প্রায় শেষ হতে চললেও এখন পর্যন্ত আবাদ হয়েছে মাত্র ৮০ হাজার হেক্টর জমি। বাকি প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিই অনাবাদি রয়ে গেছে।

বোরো আবাদ কমে যাওয়ার প্রমাণ তুলে ধরেছেন সার-বীজ বিক্রেতা ও বিদ্যুৎ অফিস। ব্যবসায়িদের মতে অন্য বছরের তুলনায় এ বছর সার-বীজ বিক্রি কমেছে অর্ধেক। ফলে টন টন বীজ কোম্পানীতে ফেরত পাঠিয়েছেন ডিলাররা। আর বিদ্যুৎ অফিস বলছে সেচ পাম্পের জন্য গত বছর জেলায় ৩৩টি সংযোগ দেয়া হলেও চাহিদা না থাকায় এ বছর সংযোগ দেয়া হয়েছে মাত্র ৮টি।

কৃষকরা বলছেন, সার-বীজের দাম, শ্রমিকের মজুরি, সেচ-হালের ব্যয় দিনদিন বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় ধানের দাম বৃদ্ধি পাওয়াতো দূরের কথা, উল্টো দিনদিন কমছে ধানের দাম। সরকারের পক্ষ থেকে ধান কেনা হলেও তা যথেষ্ট নয়। আবার সরকারি ধান সংগ্রহে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হয় না। এসব কারণে বোরো চাষ করে প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ লোকসান গুণতে হয় কৃষকদের। ফলে এ বছর অনেক কৃষকই বোরো চাষ না করে ফাঁকা রেখে দিয়েছেন ধানী জমিগুলো।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বানিয়াচং, লাখাই, মাধবপুর, সদর ও নবীগঞ্জ উপজেলায় বেশ কিছু বিস্তীর্ণ হাওর এখনও ফাঁকা পরে আছে। জমিগুলো ফেঁটে চৌচির হয়ে গেলেও চাষের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না কৃষকদের মধ্যে। কেউ কেউ আবার ধানী জমিতে বিভিন্ন ধরণের সবজি ফলিয়েছেন।

এ ব্যাপারে সদর উপজেলা লুকড়া এলাকার কৃষক আল আমীন বলেন, ‘বোরো চাষ সব চেয়ে কষ্টকর ও ব্যায়বহুল। বোরো আবাদ করতে বীজতলা তৈরী, সার প্রয়োগ, বীজতলা থেকে ছাড়া উত্তোলন, ধানী জমি প্রস্তুত, চাড়া রোপন, আবার সার প্রয়োগ, কিটনাশক প্রয়োগ, আগাছা পরিস্কার, ধান কাটা, মারাই করা ও ধান শুকিয়ে ঘরে তোলা পর্যন্ত শুধু খরচ আর খরচ। অথচ এতো খরচ আর পরিশ্রমের পরও ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। তাই এ বছর জমি করা কমিয়ে দিয়েছি।’

এ ব্যাপারে মেসার্স রনি ও নয়ন ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপক সুবীর দাশ বলেন, ‘চাহিদা না থাকার কারণে এ বছর অবিক্রিত প্রায় ২০ টনের মতো বীজ কোম্পানীর কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ৩২ মেট্রিক টনের মতো সার গোডাউনে মজুদ রয়েছে। এগুলো বিক্রি হবে বলেও আশা নেই।’

হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. তমিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘ধানের ন্যায্যমূল্য না থাকার কারণে বোরো আবাদে কৃষকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। ধানের ন্যায্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের আগ্রহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে।’

সারাদিন/৪ফেব্রুয়ারি/টিআর