‘বাংলাদেশের চেয়ে চীনে থাকাটাই ভালো ছিল’

সারাদিন ডেস্কসারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ২:৪৪ অপরাহ্ণ, ০৩/০২/২০২০

মরণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে চীনের উহান থেকে ফিরে এসেছেন ৩১২ জন বাংলাদেশি। শনিবার (১ জানুয়ারি) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটে চীন থেকে তাদের ফিরিয়ে আনা হয়। বিমানবন্দরে অবতরণের পর শরীরে জ্বর থাকায় সাতজনকে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও একজন সন্তান সম্ভবা গৃহবধূকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) পাঠানো হয়। ফিরে আসাদের মধ্যে ৩০২ জনকে কোয়ারেন্টাইন করে রাখা হয়েছে আশকোনা হজক্যাম্পে। সূত্র: বিবিসি, আলজাজিরা, সিএনএন।

আশকোনা হজক্যাম্পে নেয়া ৩০২ জনকে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী হজক্যাম্প ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় বিভিন্ন ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। হজক্যাম্পের মোট তিনটি ফ্লোরে রাখা হয়েছে বাংলাদেশিদের। কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাংলাদেশিরা বলছেন, সেখানে থাকার মতো পরিবেশ নেই। বাচ্চাদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি।

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর এলাকায় আশকোনায় কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাংলাদেশিরা বলছেন, সেখানে বাচ্চাদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। চীন থেকে আসার জন্য উদগ্রীব ছিলাম আমাদের বাচ্চাদের জন্য। কিন্তু এখানে এসে দেখি বাচ্চাদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি।

আশকোনায় হজ ক্যাম্পে থাকা দুই সন্তানের মা ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, হজ্ব ক্যাম্পে আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত পার হয়ে গেছে। কিন্তু এখানে নিজের দুই বাচ্চা নিয়ে বেশ বেকায়দাতেই তাকে পড়তে হয়েছে।

তিনি বলেন, বড়রা সারাক্ষণ মাস্ক পড়ে থাকতে পারে কিন্তু বাচ্চারা তো পারেনা। তার মতে, এর চেয়ে তো চীনে থাকাটাই ভাল ছিল। পিএইচডি করতে স্বামী আর সন্তানদের সাথে চীনে গিয়েছিলেন ফারজানা ইয়াসমিন।

ফারজানা ইয়াসমিন জানান, তারা সুরক্ষার জন্য দেশে ফিরে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে চান। যাতে এই ভাইরাস ছড়িয়ে না পড়ে। কিন্তু হজক্যাম্পের পরিবেশ কোয়ারেন্টাইনের উপযুক্ত কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

এরই মধ্যে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, যেখানে দেখা যাচ্ছে বহু মানুষ একটি কামরার মেঝেতে বিছানো সারিবদ্ধ বিছানায় থাকছেন। এভাবে তাদের রাখা নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তাদেরকে ফিরিয়ে আনা নিয়েও নানা বিতর্ক হচ্ছে।

ইয়াসমিন বলছেন, কোয়ারেন্টাইন তো করা হয় আলাদা আলাদাভাবে। এখন লোকের সংস্পর্শে এসেই যদি এরা কোয়ারেন্টাইন করে তাহলে এটা কি হলো? একই রুমের মধ্যে আমরা গ্যাদারিং করে পড়ে আছি। আমাদের রুমেই ৪০ থেকে ৫০ জন হব। এই রুমেই আছে ৮টা পরিবার। এদের মধ্যে বাচ্চারাও আছে। আবার ব্যাচেলরও আছে।

ফারজানা ইয়াসমিন জানান, তার দুই বাচ্চার মধ্যে একজনের বয়স ১০ আর আরেক জনের বয়স ৩ বছর। তিনি বলেন, গরম পানির ব্যবস্থা নেই। দুধটা খাওয়াবো সেটা খাওয়ানোর মতোও পানি নেই। তবে রোগ ছড়িয়ে পড়া নিয়ে তিনি কিছুটা কম ভয় পাচ্ছেন বলেন জানান। তারা বলছেন যে, তারা এরইমধ্যে চীনে থাকার সময়ই কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। তাদের মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা কম রয়েছে।

চীনফেরত বাংলাদেশিদের বিআরটিসির কয়েকটি বাসে করে আশকোনার হজ্ব ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলেন, প্রথম অ্যাটাক করার পর থেকেই আমরা চীনে ছিলাম। তাই যাদের অ্যাটাক করার কথা তাদের এরইমধ্যে উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার কথা। যেমন আমাদের সাথে যারা আসছিল তাদের মধ্যে দুই জনের মধ্যে জ্বর ছিল বলে তাদের চীন আসতে দেয়নি। এজন্য ভয়টা একটু কম।

স্বামী আগে দেশে ফিরলেও নিজের পিএইচডি শেষ না হওয়ায় চীনের উহানে থেকে গিয়েছিলেন শামীমা সুলতানা। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর দুই সন্তানের সাথে বাংলাদেশে ফিরেছেন তিনি।

তিনি বলছেন, এখানে এসে ভাল নেই তারা। কোয়ারেন্টাইন বলতে যা বোঝায় সেটা হচ্ছে বিচ্ছিন্ন রাখা। তো সেটাতো এখানে দেখছি না। কালকে থেকে এ পর্যন্ত যেটা দেখলাম তাতে আমার মনে হচ্ছে যে অব্যবস্থাপনার একটা বিষয় আছে। কাল থেকে যে খাবারগুলো আসছে সে খাবারগুলোর প্যাকেটও এখনো পড়ে আছে। রুম থেকে বের করে মশা মারার জন্য ধোঁয়া দিয়েছিল। এটাও আমরা আসার আগে করলে ভাল হতো। রাকিবিল তুর্য, তিনিও এসেছেন উহান থেকে। আশকোনার হজ্ব ক্যাম্পে রয়েছেন তিনি।

হজ্ব ক্যাম্পের মধ্যে অনেক জনকে একসাথে রাখার কারণে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন অনেকেই।
মিস্টার তুর্য জানান, এক রুমে এক সাথে ৫১ জন রয়েছেন তারা।

হজ ক্যাম্পের মোট তিনটি ফ্লোরে রাখা হয়েছে চীন ফেরত বাংলাদেশিদের। এরমধ্যে তিনি যে ফ্লোরে রয়েছেন সেখানে তিন রুম রয়েছে।

তিনি জানান, তিন রুমের জন্য দুটি টয়লেট আর দুটি ওয়াশরুম। রয়েছে পানির সংকটও। মাস্ক দেয়া হয়েছে সবাই।

তবে তুর্য বলেন, একই রুমে যদি গণরুমের মতো ৫০ জন করে থাকতে হয় তাহলে বাংলাদেশে এসে লাভটা কী হলো। কারো মধ্যে যদি করোনাভাইরাস থেকে থাকে তাহলে সেটা সবার মধ্যেই সংক্রমিত হবে। কারণ সবাই এক সাথে আছে। এটারই ভয় পাচ্ছি।

প্রসঙ্গত, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬২ জনে। রোববার মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৬ জনই ভাইরাসের উৎসস্থল হুবেই প্রদেশের। সেখানে এ পর্যন্ত মারা গেছেন অন্তত সাড়ে তিনশ জন। চীনে নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৮২৯ জন। দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২০৫ জন।

সারাদিন/৩ফেব্রুয়ারি/টিআর